কৃষি সংবাদ প্রতিনিধি, গাজীপুর:
লবণাক্ততার কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের অনেক জমি বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে অনাবাদি পড়ে থাকে। কোথাও ধানের ফলন কমে যায়, কোথাও কৃষকের লোকসান গুনতে হয়। এমন বাস্তবতায় উপকূলীয় কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) উদ্ভাবিত লবণাক্ততা-সহনশীল উচ্চফলনশীল ধানের নতুন জাত ‘ব্রি ধান ১১৯’। উপকূলীয় অঞ্চলের পাশাপাশি দেশের অনুকূল পরিবেশেও এটি চাষ করা যাবে।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ এখলাছুর রহমানের নেতৃত্বে ড. হাসিনা খাতুন, নুসরাত জাহান, আরমিন আক্তার সেতু এবং রিবেত ফারজানা দিশার যৌথ গবেষক দল টানা সাড়ে সাত বছর গবেষণা করে এ নতুন জাত উদ্ভাবন করেছেন। উদ্ভাবিত জাতটি রোপা আমন মৌসুমে চাষের চূড়ান্ত অনুমোদনও পেয়েছে।
কৃষি গবেষকদের আশা, স্বল্প জীবনকালের এ ধান উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষিতে শস্যবিন্যাসের পরিবর্তন আনতে সহায়তা করবে। আমন ধান কাটার পর জমিতে সূর্যমুখী ও লবণসহিষ্ণু সরিষার মতো ফসল চাষের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই জমিতে বছরে অতিরিক্ত একটি ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হলে কৃষকের আয় বাড়ার পাশাপাশি জমির ব্যবহারও বাড়বে।
গবেষকরা বলছেন, নতুন জাতটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো গাছের বিভিন্ন বৃদ্ধি পর্যায়ে লবণাক্ততা সহ্য করার ক্ষমতা। চারার পর্যায়ে জাতটি তিন সপ্তাহ পর্যন্ত প্রতি মিটারে ১২ ডেসিসিমেন্স মাত্রার লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে। অঙ্গজ বৃদ্ধি থেকে প্রজনন পর্যায়ের সংবেদনশীল ধাপগুলোতেও প্রতি মিটারে ৮-১০ ডেসিসিমেন্স মাত্রার লবণাক্ত পরিবেশে ফলন দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে।
‘ব্রি ধান ১১৯’ এর জীবনকাল প্রায় ১১৫ দিন। গাছের গড় উচ্চতা ১১৩ সেন্টিমিটার। কাণ্ড মজবুত হওয়ায় গাছ সহজে ঢলে পড়ে না। ধানের শীষ থেকে পাকা ধান সহজে ঝরে পড়ার প্রবণতাও কম। প্রতি শীষে গড়ে ২১৫টি পুষ্ট দানা পাওয়া যায়, যা প্রচলিত ‘ব্রি ধান ৭৩’ এর তুলনায় ৭০- ৮০টি বেশি।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ব্রি ধান ৭৩-এর তুলনায় নতুন জাতটির ফলন হেক্টরপ্রতি প্রায় এক টন বেশি হতে পারে। জাতটির চাল মাঝারি চিকন ও সাদা। রান্নার পর ভাত ঝরঝরে হয়। এক হাজার দানার ওজন ১৬ দশমিক ৮ গ্রাম। দানার দৈর্ঘ্য ৫ দশমিক ৯ মিলিমিটার, প্রস্থ ১ দশমিক ৮ মিলিমিটার এবং অ্যামাইলোজের পরিমাণ ২৫ দশমিক ৯ শতাংশ।
ধানের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি চালের গুণগত বৈশিষ্ট্যও বিবেচনায় নিয়েছেন গবেষকরা। ফলে ফলন ও চালের গ্রহণযোগ্যতা—দুই দিক থেকেই জাতটি কৃষকের জন্য সম্ভাবনাময় বলে মনে করছেন তারা।
গবেষক দলের প্রধান ড. মোহাম্মদ এখলাছুর রহমান বলেন, দীর্ঘ ও চ্যালেঞ্জিং এ উদ্ভাবনী যাত্রার প্রতিটি ধাপে তার দল নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছে। কৃষকের মাঠে এ গবেষণার সুফল দেখতে পাওয়াই তাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। গত ২৮ অক্টোবর জাতীয় বীজ বোর্ডের ১১৬তম সভায় জাতটির অনুমোদন দেওয়া হয়।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, উপযুক্ত পরিচর্যায় ব্রি ধান ১১৯ এর গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৫ দশমিক ৭ টন। পরিবেশ ও লবণাক্ততার মাত্রাভেদে ফলন হতে পারে ৪ দশমিক ৮ থেকে ৭ দশমিক ৬ টন পর্যন্ত।
রোপা আমন মৌসুমে ব্রি ধান ১১৯-এর বীজ ১-৩০ জুলাইয়ের মধ্যে বপন করতে হবে। ২৫-৩০ দিন বয়সী চারা প্রতি গোছায় ২-৩টি করে রোপণ করতে হবে। সারি থেকে সারির দূরত্ব ২০ সেন্টিমিটার। গোছা থেকে গোছার দূরত্ব ১৫ সেন্টিমিটার রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। মাঝারি উঁচু থেকে উঁচু জমি এ জাতের জন্য উপযোগী।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ব্রি ধান ১১৯ আমাদের কৃষি বিজ্ঞানীদের আধুনিক প্রজনন দক্ষতার এক অনন্য নিদর্শন। এটি শুধু লবণাক্ত উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষকদের আশার আলো দেখাবে না, বরং খাদ্যনিরাপত্তা জোরদার এবং কৃষকের উৎপাদন ও আয় বাড়াতেও গুরুপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’
এ বিষয়ে ব্রি’র উদ্ভিদ প্রজনন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. খোন্দকার মো. ইফতেখারুদ্দৌলা বলেন, ‘মাত্র সাড়ে সাত বছরে এ ধরনের উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন বড় অর্জন। লবণাক্ততা সহ্য করার পাশাপাশি অনুকূল পরিবেশেও এর উচ্চ ফলন কৃষিতে বৈচিত্র্য আনতে সহায়তা করবে।’