1. admin@krishisangbad.com : admin :
  2. siddique149096@bsdi-bd.org : md abu bakar siddique rasim : md abu bakar siddique rasim
পোলট্রিতে সৌরশক্তির সম্ভাবনা, লাভ ও বাস্তব চ্যালেঞ্জ - কৃষি সংবাদ
রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:৫৫ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
বন্দরের সব অর্থ সরকারি ব্যাংকে রাখার সুপারিশ সংসদীয় কমিটির সমবায় আন্দোলনকে পুনরুজ্জীবিত করার আহ্বান রাষ্ট্রপতির রমজানে ১১ পণ্যের এলসি খোলা সহজ করলো বাংলাদেশ ব্যাংক তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন এসেছে: প্রতিমন্ত্রী টুকু গাড়ির ধোঁয়া ও নির্মাণের ধুলায় বিষাক্ত হচ্ছে ঢাকার বাতাস পোলট্রিতে সৌরশক্তির সম্ভাবনা, লাভ ও বাস্তব চ্যালেঞ্জ আমন ধান ৩৫ এবং চাল ৪৯ টাকায় সংগ্রহ করবে সরকার পার্বত্য অঞ্চলে কফি ও কাজুবাদাম চাষের অপার সম্ভাবনা রয়েছে: সাচিং প্রু পেঁয়াজের দাম কমেছে কেজিতে ১৫ টাকা লবণাক্ততা-সহনশীল উচ্চফলনশীল ধানের নতুন জাত ‘ব্রি ধান ১১৯’

পোলট্রিতে সৌরশক্তির সম্ভাবনা, লাভ ও বাস্তব চ্যালেঞ্জ

  • প্রকাশের সময় : রবিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২৬
  • ৩৪ বার পঠিত

শামসুল আরেফিন খালেদ:

গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমে একটি পোলট্রি খামারের কথা ভাবুন। শেডের ভেতরে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল। বন্ধ হয়ে গেল ফ্যান ও ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা। কিছুক্ষণের মধ্যেই শত শত মুরগি মারা যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলো। বাংলাদেশের অনেক খামারির কাছে এমন পরিস্থিতি নতুন নয়। অথচ এই সমস্যার একটি সম্ভাব্য সমাধান রযেছে খামারের ছাদেই-সৌরবিদ্যুৎ।

প্রশ্ন হলো, সৌরবিদ্যুৎ কি সত্যিই আমাদের পোলট্রি খামারগুলোর জন্য লাভজনক ও টেকসই সমাধান হতে পারে? বিশেষ করে দেশের হাজার হাজার ছোট খামারি কি এই প্রযুক্তির সুবিধা নিতে পারবেন? আমার মতে, সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা অবশ্যই রযেছে। তবে শুধু পরিবেশ রক্ষার আবেগ দিয়ে নয়, খামারির আর্থিক সক্ষমতা, প্রযুক্তির কার্যকারিতা এবং বিনিযোগের প্রকৃত লাভ-ক্ষতি বিবেচনা করেই এগোতে হবে।

পোলট্রি শিল্পের অগ্রগতি, নতুন চ্যালেঞ্জ
গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের পোলট্রি শিল্প এক অসাধারণ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগিযেছে। ডিম ও মুরগির মাংস এখন দেশের মানুষের সাশ্রয়ী প্রাণিজ আমিষের অন্যতম প্রধান উৎস। ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ৮০ কোটি বাণিজ্যিক ব্রয়লার এবং আরও প্রায় ২০ কোটি সোনালি ও অন্যান্য রঙিন মুরগি উৎপাদিত হয়। লেয়ার মুরগির সংখ্যা প্রায় ৮ কোটি ২০ লাখ। হ্যাচারিগুলো বছরে ১১১ কোটির বেশি বাচ্চা উৎপাদন করে।

এই শিল্পের সঙ্গে লাখ লাখ মানুষের জীবিকা জড়িত। ছোট খামারি থেকে শুরু করে ব্রিডার, হ্যাচারি, ফিড মিল, পরিবহন, বিপণন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠান-সবাই মিলে গড়ে তুলেছেন একটি বিশাল সরবরাহব্যবস্থা। দেশের প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণে এই শিল্পের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে নতুন কিছু চ্যালেঞ্জও সামনে এসেছে। বিদ্যুতের ব্যয়, তাপপ্রবাহ, উৎপাদন খরচ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশের ওপর চাপ ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হযে উঠছে। ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশনের একটি হিসাব অনুযায়ী, দেশের ব্রয়লার, লেয়ার ও হ্যাচারি কার্যক্রমের সঙ্গে বছরে প্রায় ১ কোটি ২১ লাখ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ সম্পর্কিত।

আমাদের সামনে তাই দুটি দায়িত্ব। একদিকে সাশ্রয়ী মূল্যে ডিম ও মুরগির মাংসের উৎপাদন বাড়াতে হবে, অন্যদিকে উৎপাদনব্যবস্থাকে আরও দক্ষ ও পরিবেশবান্ধব করতে হবে। তবে পরিবেশ রক্ষার নামে এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত নয়, যা খামারির উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে তাঁকে আরও আর্থিক সংকটে ফেলে।
সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা কতটা
বাংলাদেশের অনেক পোলট্টি শেডের বড় ছাদ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য উপযোগী হতে পারে। দিনের বেলায় সোলার প্যানেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দিয়ে ফ্যান, আলো, পানির পাম্প ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি চালানো সম্ভব। উপযুক্ত ব্যাটারি ও ব্যাকআপ ব্যবস্থা থাকলে লোডশেডিংয়ের সময়ও জরুরি যন্ত্রপাতি সচল রাখা যায়।

বিশেষ করে ব্রিডার, বড় লেয়ার ও আধুনিক ব্রয়লার খামারে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে সৌরবিদ্যুৎ শুধু বিদ্যুৎ বিল কমানোর উপায় নয়, উৎপাদন ঝুঁকি কমানোর একটি সম্ভাব্য মাধ্যমও হতে পারে।

বাংলাদেশের ২০২৫ সালের নেট মিটারিং নীতিমালায় নির্ধারিত শর্ত অনুযায়ী ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন এবং উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহের সুযোগ রযেছে। এর ফলে উপযুক্ত খামার বিদ্যুৎ বিল কমানোর পাশাপাশি অতিরিক্ত বিদ্যুতের বিপরীতে বিল সমন্বয়ের সুবিধা পেতে পারে।

তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা দরকার। শুধু সোলার প্যানেল বসালেই লোডশেডিংযের সময় ফ্যান চলবে না। এজন্য উপযুক্ত হাইব্রিড ইনভার্টার, ব্যাটারি ও নির্ভরযোগ্য ব্যাকআপ ব্যবস্থা প্রযোজন। খামারের জীবনরক্ষাকারী ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা কোনোভাবেই অনিশ্চিত বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল রাখা যাবে না।

গবেষণার হিসাব আশাব্যঞ্জক, কিন্তু বাস্তবতা কী

সম্প্রতি ওয়ার্ল্ডস পোলট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ শাখার (WPSA-BB) একটি সেমিনারে উপস্থাপিত গবেষণাপত্রে বিভিন্ন আকারের ব্রয়লার খামারে সৌরবিদ্যুৎ, বাযোগ্যাস ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী প্রযুক্তির সম্ভাব্য আর্থিক সুবিধা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষণায় প্রতি ব্যাচে ২ হাজার মুরগির একটি ছোট খামারে বাযোগ্যাস, এলইডি বাতি ও ২ কিলোওয়াট পিক সোলার ব্যবস্থায় প্রায় ৭ লাখ ৫ হাজার টাকা বিনিযোগের বিপরীতে বছরে ১ লাখ ৬২ হাজার টাকা সাশ্রযের সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে। সাধারণ হিসাবে বিনিযোগ ফেরত আসতে প্রায় ৪ বছর ৪ মাস লাগতে পারে। তবে এই সাশ্রয়ের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এসেছে বাযোগ্যাস থেকে।

একই গবেষণায় প্রতি ব্যাচে ২০ হাজার মুরগির মাঝারি খামারে প্রায় ৫১ লাখ টাকা বিনিযোগের বিপরীতে বছরে সাড়ে ১০ লাখ টাকা সাশ্রয়ের সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে। অন্যদিকে প্রতি ব্যাচে ১ লাখ মুরগির বড় খামারে প্রায় সাড়ে ৮ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে বছরে ২ কোটি ৬ লাখ টাকা আর্থিক সুবিধা পাওয়ার অনুমান করা হযেছে। তিনটি মডেলেই সাধারণ হিসাবে বিনিযোগ ফেরতের সময় প্রায় চার থেকে পাঁচ বছর। সংখ্যাগুলো নিঃসন্দেহে উৎসাহব্যঞ্জক। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের একজন ছোট খামারির কাছে চার-পাঁচ বছরে বিনিযোগ ফেরত পাওয়ার প্রতিশ্রুতি কতটা আকর্ষণীয়, যখন তিনি অনেক সময় পরবর্তী ব্যাচের বাচ্চা ও খাদ্য কেনার অর্থ জোগাড় করতেই হিমশিম খান?

গবেষণার হিসাব আর বাস্তব ব্যবসার ফল এক নয়। বিদ্যুতের দাম, ঋণের সুদ, খামার বন্ধ থাকার সময়, ব্যাটারি পরিবর্তন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং উৎপাদিত উপজাতের বাজারমূল্য বিবেচনা করলে প্রকৃত লাভের পরিমাণ বদলে যেতে পারে। তাই এসব হিসাবকে নিশ্চিত লাভ হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না।

দেশে প্রতি ব্যাচে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার মুরগি উৎপাদনক্ষম একটি বড় খামারে সমন্বিত স্মার্ট প্রযুক্তি ব্যবহারের উদাহরণও গবেষণায় তুলে ধরা হয়েছে। উপস্থাপিত হিসাবে খামারটিতে বছরে প্রায় ১ হাজার ৪৭০ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য নিঃসরণ কমার এবং প্রায় ২ কোটি ৬৬ লাখ টাকার আর্থিক সুবিধা পাওয়ার কথা বলা হযেছে।

এটি সম্ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। তবে একটি বড় খামারের অভিজ্ঞতা দিযে দেশের সব খামারের জন্য একই সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।

কার্বন কমানোর সবচেয়ে বড় সুযোগ সোলারে নয়, খাদ্যে
পোলট্রি শিল্পের কার্বন নিঃসরণ নিয়ে আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়্য অনেক সময় আড়ালে থেকে যায়। তা হলো, একটি মুরগির মোট কার্বন নিঃসরণের সবচেয়ে বড় অংশ আসে খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ থেকে।

আলোচ্য গবেষণার হিসাবে, ব্রয়লারের মোট কার্বন নিঃসরণের প্রায় ৭৮ শতাংশ খাদ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। খামারের বিদ্যুৎ থেকে আসে প্রায় ৮ শতাংশ এবং লিটার ও সংশ্লিষ্ট বর্জ্য থেকে প্রায় ৬ শতাংশ। অর্থাৎ খামারে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করলেও কার্বন নিঃসরণের সবচেয়ে বড় উৎসটি থেকে যায়।

ভুট্টা ও সয়াবিন চাষ, শুকানো, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন এবং ফিড উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যাযে কার্বন নিঃসরণ হয়। তাই পরিবেশবান্ধব পোলট্রি উৎপাদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগুলোর একটি হলো খাদ্যের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করা।
গবেষণার অনুমান অনুযায়ী, ব্রয়লারের FCR ১.৬০ থেকে ১.৫০-এ নামানো গেলে প্রতি কেজি মাংস উৎপাদনে কার্বন নিঃসরণ প্রায় ৫ শতাংশ কমতে পারে। দেশের মোট ব্রয়লার উৎপাদনের ওপর এই উন্নতির সম্ভাব্য প্রভাব বছরে প্রায় ৩ লাখ ৩৫ হাজার টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য।

আমার মতে, এখানেই আমাদের অগ্রাধিকারের বিষয়টি পরিষ্কার। ভালো খাদ্য, উন্নত FCR, কম মৃত্যুহার এবং সঠিক খামার ব্যবস্থাপনা ছাড়া শুধু সোলার প্যানেল বসিয়ে পোলট্রি শিল্পকে পরিবেশবান্ধব করা সম্ভব নয়।একটি সুস্থ মুরগি, যা কম খাদ্যে কাঙ্ক্ষিত ওজন অর্জন করে এবং বিক্রির উপযোগী হয, সেটিই সম্পদের দক্ষ ব্যবহারের ভালো উদাহরণ। তাই পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের আলোচনা শুরু হওয়া উচিত খামারের সামগ্রিক দক্ষতা থেকে, শুধু বিদ্যুতের উৎস পরিবর্তন থেকে নয়।

ছোট খামারির বাস্তবতা ভুলে গেলে চলবে না
বাংলাদেশের পোলট্রি শিল্পের একটি বড় অংশ ছোট ও মাঝারি খামারিদের ওপর নির্ভরশীল। তাঁদের জন্য সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের সম্ভাবনা থাকলেও অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও রক্ষণাবেক্ষণের বাধাগুলো অত্যন্ত বাস্তব।

একজন ছোট খামারির জন্য সাত লাখ টাকার বেশি বিনিযোগ অনেক বড় সিদ্ধান্ত। তাঁর আয় নির্ভর করে বাচ্চার দাম, খাদ্যের দাম, বাজারে মুরগির বিক্রয়মূল্য, রোগবালাই এবং উৎপাদন ফলাফলের ওপর। এসব অনিশ্চয়তার মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি বিনিযোগের ঝুঁকি নেওয়া সহজ নয়।

দ্বিতীয়ত, ছোট খামারের জন্য বাজারে পাওয়া প্রযুক্তি কতটা উপযোগী, সেটিও প্রশ্ন। বড় খামারের জন্য তৈরি ব্যয়বহুল সোলার ও ব্যাটারি ব্যবস্থা ছোট খামারে একইভাবে লাভজনক নাও হতে পারে। ছোট খামারির প্রযোজন সীমিত বিনিযোগে জরুরি ফ্যান, আলো ও পানি সরবরাহ চালু রাখার মতো সহজ ও নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা।

তৃতীয়ত, রক্ষণাবেক্ষণের বিষ্যটি অবহেলা করা যাবে না। সোলার প্যানেল পরিষ্কার রাখা, ইনভার্টার মেরামত, ব্যাটারি পরিবর্তন এবং যন্ত্রপাতির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য স্থানীয় পর্যায়ে দক্ষ জনবল প্রযোজন। যথাযথ বিক্রয়োত্তর সেবা না থাকলে লাভজনক বিনিযোগও একসময় খামারির জন্য বোঝা হয়ে উঠতে পারে।

আমার বিবেচনায়, বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্রিডার, বড় ও মাঝারি লেয়ার এবং বড় বাণিজ্যিক ব্রয়লার খামারে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে বেশি। এসব খামারে বিদ্যুতের চাহিদা নিয়মিত, ছাদের আয়তন বড় এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিযোগ পরিকল্পনার সুযোগও বেশি।

অন্যদিকে ছোট খামারের জন্য এখনই বড় সোলার প্রকল্পের পরিবর্তে কম খরচের বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী প্রযুক্তি, নির্ভরযোগ্য জরুরি ব্যাকআপ এবং ছোট আকারের সোলার ব্যবস্থার কার্যকারিতা পরীক্ষা করা বেশি যুক্তিসংগত।

সার্কুলার ইকোনমি: সম্ভাবনা আছে, বাস্তবায়ন কঠিন

পোলট্রি বর্জ্য থেকে বাযোগ্যাস, জৈব সার ও অন্যান্য মূল্যবান পণ্য তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে। এটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে বাংলাদেশের ছোট খামারিদের বাস্তবতা বিবেচনা না করে সার্কুলার ইকোনমির ধারণা বাস্তবায়ন করা কঠিন। একটি ছোট খামারে আলাদাভাবে বাযোগ্যাস প্ল্যান্ট, জৈব সার উৎপাদন ইউনিট কিংবা রেন্ডারিং প্ল্যান্ট স্থাপন করতে জমি, অর্থ, প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবল প্রযোজন। পাশাপাশি উৎপাদিত কম্পোস্ট, স্লারি বা অন্যান্য পণ্য বিক্রির নির্ভরযোগ্য বাজার থাকতে হবে। শুধু বর্জ্য থেকে পণ্য তৈরি করলেই লাভ হবে না; সেই পণ্য বিক্রি করতে না পারলে প্রকল্পটি টিকবে না।

এক্ষেত্রে আঞ্চলিক সমন্বিত বর্জ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা একটি সম্ভাব্য বিকল্প হতে পারে। নির্দিষ্ট এলাকার অনেক খামার থেকে নিরাপদভাবে বর্জ্য সংগ্রহ করে কেন্দ্রীয় স্থাপনায় প্রক্রিয়াজাত করা গেলে একক খামারির বিনিযোগের চাপ কমতে পারে।

তবে এ ধরনের প্রকল্পে আমি একটি বিষ্যকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে চাই-পরিবেশ রক্ষা করতে গিযে কোনোভাবেই বাযোসিকিউরিটি নষ্ট করা যাবে না।

বিশেষ করে মৃত মুরগি ও সংক্রামক বর্জ্য এক খামার থেকে অন্য এলাকায় পরিবহনের মাধ্যমে রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই রেন্ডারিং বা কেন্দ্রীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের আগে কঠোর বাযোসিকিউরিটি, নিরাপদ পরিবহন, জীবাণুমুক্তকরণ, পরিবেশগত অনুমোদন এবং স্থানীয় মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষ্যগুলো নিশ্চিত করতে হবে।

একইভাবে দুর্গন্ধ, পানি ও মাটিদূষণ কিংবা আশপাশের মানুষের জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে এমন কোনো প্রকল্পকে পরিবেশবান্ধব বলা যায় না। একটি উদ্যোগ ব্যবসায়িকভাবে লাভজনক হলেও তা যদি অন্য মানুষের ক্ষতির কারণ হয়, তাহলে সেটি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

আমার মতে, ছোট খামারিদের সার্কুলার ইকোনমিতে যুক্ত করতে হলে আগে আঞ্চলিক পর্যাযে পরীক্ষামূলক প্রকল্প, অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাই এবং নিরাপদ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কার্যকর মডেল তৈরি করতে হবে। এ কাজে সরকারি সহায়তা ও শিল্পের সম্মিলিত উদ্যোগ অপরিহার্য।

খামারির আগে দরকার সচেতনতা, তারপর বিনিযোগ
স্মার্ট খামার এক দিনে তৈরি হয় না। শুরুতেই বড় অঙ্কের বিনিযোগ করার পরিবর্তে ধাপে ধাপে এগোনো বেশি বাস্তবসম্মত।
প্রথমে খামারের বিদ্যুৎ ব্যবহার, খাদ্য খরচ, FCR, মৃত্যুহার এবং বর্জ্যের পরিমাণ নিয়মিত হিসাব করতে হবে। কোথায় অপচয় হচ্ছে, তা না জানলে কোন প্রযুক্তি কতটা কাজে আসবে, সেটিও বোঝা যাবে না।

এরপর কম খরচে যেসব উন্নতি সম্ভব, সেগুলো আগে করতে হবে। যেমন, এলইডি বাতি, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী ফ্যান, ভালো ভেন্টিলেশন, সঠিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং কঠোর বাযোসিকিউরিটি। মৃত্যুহার ৫ শতাংশ থেকে ৩ শতাংশে নামানো গেলে একই উৎপাদন ব্যবস্থায় আরও বেশি মুরগি বিক্রি করা সম্ভব হবে। এতে খরচ ও প্রতি কেজি বিক্রয়যোগ্য মাংসের কার্বন নিঃসরণ কমানোর সুযোগ তৈরি হয। বড় বিনিযোগের আগে খামারির জানা দরকার মোট খরচ কত, বছরে কত সাশ্রয় হবে, কত বছরে বিনিযোগ ফেরত আসবে, ঋণের সুদ কত এবং ভবিষ্যতে ব্যাটারি বা অন্যান্য যন্ত্রপাতি পরিবর্তনে কত টাকা লাগবে।

প্রযুক্তি সরবরাহকারীদেরও দায়িত্ব রযেছে। সম্ভাব্য লাভ বাড়িয়ে দেখিযে প্রযুক্তি বিক্রি করা উচিত নয়। খামারিকে প্রকৃত বিনিযোগ ব্যয়, পরিচালন খরচ, রক্ষণাবেক্ষণ, ঝুঁকি এবং সম্ভাব্য রিটার্ন সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা দিতে হবে।

শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও দায়িত্ব নিতে হবে
পোলট্রি শিল্পকে পরিবেশবান্ধব করার দায়িত্ব শুধু খামারির ওপর চাপিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। ফিড কোম্পানি, ইন্টিগ্রেটর, প্রযুক্তি সরবরাহকারী এবং অন্যান্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানকেও এগিয়ে আসতে হবে।

ফিড কোম্পানিগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো উন্নত মানের খাদ্য সরবরাহের মাধ্যমে FCR উন্নত করা, খাদ্যের অপচয় কমানো এবং খামারিদের উৎপাদন দক্ষতা বাড়াতে কারিগরি সহাযতা দেওয়া। কারণ কার্বন নিঃসরণের সবচেয়ে বড় অংশ খাদ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।

বড় ইন্টিগ্রেটররা চুক্তিবদ্ধ খামারিদের জন্য যৌথভাবে সোলার সরঞ্জাম কেনা, সহজ অর্থায়ন, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং নিরাপদ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নিতে পারে। এতে ছোট খামারির বিনিযোগ ও প্রযুক্তিগত ঝুঁকি কমানো সম্ভব হতে পারে।

তবে এসব উদ্যোগে আর্থিক স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে হবে। যৌথ প্রকল্পে খামারি, প্রযুক্তি সরবরাহকারী ও ইন্টিগ্রেটর-কে কত বিনিযোগ করছেন, কে কত ঝুঁকি নিচ্ছেন এবং কে কত সুবিধা পাবেন, তা আগেই নির্ধারণ করা উচিত। প্রকৃত রিটার্ন সম্পর্কে সবাইকে সঠিক তথ্য দিতে হবে।

কার্বন ক্রেডিট থেকেও ভবিষ্যতে আয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু এর পরিমাপ, যাচাই ও নিবন্ধনের খরচ রযেছে। তাই শুধু কার্বন ক্রেডিটের সম্ভাব্য আযের ওপর নির্ভর করে কোনো প্রকল্প গ্রহণ করা যুক্তিসংগত নয়।

সরকারি সহায়তা ছাড়া পরিবর্তন কঠিন
আমাদের দেশে অনেক ভালো প্রযুক্তি ও উদ্যোগ অর্থায়ন এবং বাস্তবায়ন কাঠামোর অভাবে সফল হতে পারে না। পোলট্রি খাতে সৌরবিদ্যুৎ ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও একই ঝুঁকি রয়েছে।

ছোট ও মাঝারি খামারিদের জন্য কম সুদে দীর্ঘমেয়াদি সবুজ ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। ঋণের কিস্তি ও পরিশোধের সময় এমনভাবে নির্ধারণ করা উচিত, যাতে তা খামারির নগদ প্রবাহের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। একই সঙ্গে ঝণের আবেদন ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। নেট মিটারিংয়ের অনুমোদন দ্রুত ও স্বচ্ছ হওয়া জরুরি। বিদ্যুৎ বিলের ক্রেডিট নিয়মিত সমন্বয় না হলে প্রকল্পের প্রত্যাশিত আর্থিক সুবিধা কমে যাবে। পোলট্রি খাতের উন্নয়ন নীতি ও পরিকল্পনার সঙ্গেও নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সবুজ অর্থায়ন এবং নিরাপদ বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে যুক্ত করা প্রযোজন।

এছাড়া উপজেলা পর্যায়ে প্রশিক্ষিত টেকনিশিয়ান ও নির্ভরযোগ্য বিক্রয়োত্তর সেবার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। খামারি ও ব্যাংক যেন একই পদ্ধতিতে প্রকল্পের আর্থিক সম্ভাবনা যাচাই করতে পারে, সেজন্য একটি সহজ বিনিযোগ মূল্যায়ন পদ্ধতিও তৈরি করা যেতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সরকারি সুবিধা যেন শুধু বড় প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। ছোট খামারিদের আর্থিক সক্ষমতা ও বাস্তব চাহিদা অনুযায়ী পৃথক সহাযতা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

ওয়াপসা-বিবিকে গবেষণা থেকে বাস্তব সমাধানে এগোতে হবে

আমার মতে, বাংলাদেশের পোলট্রি শিল্পে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে ওয়ার্ল্ডস পোলট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ শাখার (WPSA-BB) আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

শুধু সেমিনার ও গবেষণাপত্র উপস্থাপন করলেই হবে না। গবেষণার ফলাফলকে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নযোগ্য সমাধানে রূপ দিতে হবে। বিশেষ করে ছোট, মাঝারি ও বড় খামারের জন্য পৃথক প্রযুক্তিগত ও আর্থিক মডেল তৈরি করা জরুরি।

আমাদের জানতে হবে, কোন আকারের খামারে কতটুকু সোলার প্রযোজন, ব্যাটারির প্রকৃত খরচ কত, কোন প্রযুক্তিতে বিনিযোগ দ্রুত ফেরত আসে এবং ছোট খামারিদের জন্য কোন ধরনের অর্থায়ন সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে।

একইভাবে বাযোগ্যাস, জৈব সার ও রেন্ডারিংয়ের জন্য আঞ্চলিক সমন্বিত প্রকল্প কতটা বাস্তবসম্মত, তা যাচাই করতে হবে। বিশেষ করে বাযোসিকিউরিটি, পরিবেশগত নিরাপত্তা, পরিচালন খরচ এবং উৎপাদিত পণ্যের বাজার নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা প্রযোজন।

ওয়াপসা-বিবি বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সরকারি সংস্থা, ব্যাংক, প্রযুক্তি সরবরাহকারী ও পোলট্রি শিল্পের উদ্যোক্তাদের নিয়ে যৌথ পরীক্ষামূলক প্রকল্প গ্রহণে সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করতে পারে। এসব প্রকল্পের ফলাফল স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা হলে খামারি ও বিনিযোগকারীরা বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
আমার বিশ্বাস, গবেষণার সাফল্য শুধু কতটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হলো, তা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। বরং সেই গবেষণা কতজন খামারির উৎপাদন খরচ কমাতে, আয় বাড়াতে এবং নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদনে সহায়তা করল, সেটিই হওয়া উচিত প্রকৃত মূল্যায়নের ভিত্তি। শেষ কথা: পরিবেশ রক্ষা ও খামারির লাভ দুটিই জরুরি
বাংলাদেশের পোলট্রি শিল্পকে আরও উৎপাদনশীল, প্রতিযোগিতামূলক ও পরিবেশবান্ধব করতে সৌরবিদ্যুৎ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু এটিকে একমাত্র সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। উন্নত খাদ্য, ভালো FCR, কার্যকর বাযোসিকিউরিটি, কম মৃত্যুহার, দক্ষ বিদ্যুৎ ব্যবহার এবং নিরাপদ বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে একসঙ্গে গুরুত্ব দিতে হবে।

এখানে আমাদের দুটি বিষয় নিশ্চিত করতে হবে। প্রথমত, পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগ যেন সত্যিকার অর্থে পরিবেশবান্ধব, নিরাপদ ও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয়। দ্বিতীয়ত, সেই উদ্যোগ যেন খামারির জন্য আর্থিকভাবে বাস্তবসম্মত ও লাভজনক হয়।
পরিবেশ রক্ষার নামে খামারির ওপর এমন বিনিযোগের বোঝা চাপানো উচিত নয়, যা তিনি বহন করতে পারবেন না। আবার উৎপাদন খরচ কমানোর নামে এমন প্রযুক্তিও গ্রহণ করা যাবে না, যা বাযোসিকিউরিটি নষ্ট করে কিংবা আশপাশের মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ক্ষতি করে।

তাই বড় খামারের সফল প্রযুক্তি ছোট খামারে সরাসরি প্রযোগ না করে খামারের আকার, আর্থিক সক্ষমতা, উৎপাদনব্যবস্থা এবং স্থানীয় বাস্তবতা অনুযাযী সমাধান তৈরি করতে হবে। এর ভিত্তি হতে হবে নির্ভরযোগ্য গবেষণা, মাঠপর্যায়ে পরীক্ষিত ফলাফল এবং স্বচ্ছ আর্থিক বিশ্লেষণ।

সরকার, ব্যাংক, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, ফিড কোম্পানি, ইন্টিগ্রেটর, প্রযুক্তি সরবরাহকারী ও খামারিদের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এই পরিবর্তন সম্ভব নয়। বিশেষ করে ওয়াপসা-বিবিকে গবেষণাভিত্তিক, খামারিবান্ধব ও বাস্তবায়নযোগ্য সমাধান তৈরিতে নেতৃত্ব দিতে হবে।

আমাদের লক্ষ্য শুধু কার্বন নিঃসরণ কমানো নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি পোলট্রি শিল্প গড়ে তোলা, যেখানে উৎপাদন খরচ কমবে, খামারির আয় ও সক্ষমতা বাড়বে, প্রাণিস্বাস্থ্য ও বাযোসিকিউরিটি সুরক্ষিত থাকবে এবং পরিবেশের ওপর চাপ কমবে।

সৌরশক্তির প্রকৃত সফলতা তখনই আসবে, যখন এটি শুধু বড় খামারের প্রযুক্তি হযে থাকবে না; ছোট ও মাঝারি খামারিরাও আর্থিকভাবে লাভবান হযে এর সুবিধা নিতে পারবেন। পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ও লাভজনক ব্যবসাকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়াই হওয়া উচিত আমাদের মূল লক্ষ্য।

লেখক: সভাপতি, ওয়ার্ল্ডস পোলট্রি সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন-বাংলাদেশ শাখা (ওয়াপসা-বিবি)।

Facebook Comments Box
এই ক্যাটাগরির আরও খবর
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৪ কৃষি সংবাদ
Theme Customized By Shakil IT Park