কৃষি সংবাদ প্রতিবেদক:
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ কোনো দল, গোষ্ঠী বা ব্যক্তির একক রাজনৈতিক ভাষ্য প্রতিষ্ঠার স্থান হবে না।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান কোনো একক ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা দলের নয়; এর প্রকৃত নায়ক দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণ।
বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানের আগে প্রধানমন্ত্রী জাদুঘরের ফলক উন্মোচন করেন। এ সময় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুস উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণ আশা করে, এই জাদুঘর কোনো একটি দল, গোষ্ঠী বা ব্যক্তির একক রাজনৈতিক ভাষ্য প্রতিষ্ঠার স্থান হবে না। কারণ, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল জনগণের আন্দোলন।”
তিনি আরও বলেন, “১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল স্বাধীনতা অর্জনের, আর ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার। জনগণ যেমন মুক্তিযোদ্ধাদের ভুলে যায়নি, তেমনি ২০২৪ সালে শহীদদের আত্মত্যাগও কখনো ভুলবে না।”
শহীদদের নামে প্রতিষ্ঠানের নামকরণ
প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে তাঁদের নিজ নিজ এলাকায় সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কিংবা সড়কের নামকরণ করা হবে।
আহত জুলাই যোদ্ধাদের চিকিৎসা ও ভাতা
তিনি জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহতদের সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। গুরুতর আহতদের থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, তুরস্ক, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে ৫০ জন জুলাই যোদ্ধা বিদেশে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। গেজেটভুক্ত ১৩ হাজারের বেশি জুলাই যোদ্ধাকে তাঁদের নিজস্ব ব্যাংক হিসাবে শ্রেণিভিত্তিক মাসিক সম্মানী ভাতা দেওয়া হচ্ছে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কাজ শুরু
তারেক রহমান বলেন, শহীদদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে সরকারের ৩১ দফা নির্বাচনী ইশতেহারের পাশাপাশি জাতীয় সংসদের সাউথ প্লাজায় স্বাক্ষরিত ‘জুলাই সনদ’-এর বাস্তবায়ন কার্যক্রমও শুরু হয়েছে।
তিনি জানান, গণভোটের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে গঠিত সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটিও কাজ শুরু করেছে।
অস্থিরতা সৃষ্টির অপচেষ্টার অভিযোগ
দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে কেউ কেউ অহেতুক ইস্যু তৈরি করে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির অপচেষ্টা করছেন। এতে তারা নিজেদের অজান্তেই পতিত স্বৈরাচারের পুনরুত্থানের পথ সুগম করছেন কি না, তা ভেবে দেখা প্রয়োজন।”
সশস্ত্র বাহিনীকে ধন্যবাদ
গণতন্ত্র ও জনগণের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এই বাংলাদেশ আর কখনোই তাবেদার রাষ্ট্রে পরিণত হবে না, ইনশাআল্লাহ।”
‘৫ আগস্ট গণতন্ত্রের ইতিহাসে যুগান্তকারী মাইলফলক’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে হাজার হাজার মানুষ গুম, অপহরণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। শুধু জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানেই হাজারো ছাত্র-জনতা, নারী ও শিশু শহীদ হয়েছেন এবং অন্তত ৩০ হাজার মানুষ আহত হয়েছেন।
তিনি ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের সব শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এবং হতাহত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।
জাদুঘরে সংরক্ষণের আহ্বান
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই জাদুঘরে শুধু জুলাই গণঅভ্যুত্থান নয়, বাংলাদেশের সব গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাসও সংরক্ষিত থাকা উচিত।
তিনি বলেন, শহীদদের জীবনকথা, আহতদের সাক্ষ্য, অংশগ্রহণকারীদের অভিজ্ঞতা, আলোকচিত্র, ভিডিও, সংবাদ প্রতিবেদন, পোস্টার, দেয়াললিখন, গ্রাফিতি, কার্টুন, কবিতা, গান, নাটক, চিত্রকর্ম, ব্যক্তিগত স্মারক ও ডিজিটাল উপাদান সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইতিহাস রচনায় সত্যতা নিশ্চিত করতে হবে। “অসম্পূর্ণ, অতিরঞ্জিত বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বয়ান ইতিহাসকে শক্তিশালী করে না; বরং ইতিহাসের বিশ্বাসযোগ্যতাকে দুর্বল করে এবং ভবিষ্যতে বিভেদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।”
বিচারের আশ্বাস
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে হতাহতদের প্রতিটি ঘটনার বিচার পর্যায়ক্রমে হবে। আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য বিচার নিশ্চিত করা হবে।
সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায়ের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুস, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, প্রধানমন্ত্রীর সংস্কৃতি ও তথ্য-সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান এবং সংস্কৃতি সচিব কানিজ মাওলা।
অনুষ্ঠানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ আবদুল্লাহ বিন জাহিদের মা ফাতেমাতুজ্জোহরা, শহীদ শাহরিয়ার খান আনসারের মা সানজিদা খান দীপ্তি এবং জুলাই যোদ্ধা নিশাত তাবাসসুম প্রাপ্তি আবেগঘন বক্তব্য রাখেন।
এ ছাড়া ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল, মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য, তিন বাহিনীর প্রধান, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার, কূটনীতিক, শিক্ষাবিদ, বিশিষ্ট নাগরিক এবং সরকারি-বেসরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমানও অনুষ্ঠানে অংশ নেন।