জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক:
সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ১২৫ টি। তবে শাবকের সংখ্যা ২১ টি। ২০২৩-২৪ সালের বাঘজরীপে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাঘ শাবকের ছবি পাওয়া যায়। তবে বাঘ শাবকের সংখ্যা জরীপের ফলাফলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়না। কারণ ছোট থেকে পূর্ণবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত বাঘ শাবকের মৃত্যুর হার অনেক বেশী হয়ে থাকে। ২০২৩-২৪ সালের বাঘজরীপে ২১টি বাঘ শাবকের ছবি পাওয়া গেছে, যেখানে ২০১৫ ও ২০১৮ সালের বাঘজরীপে মাত্র ০৫টি করে বাঘ শাবকের ছবি পাওয়া গিয়েছিল। তবে ২০১৫ সালে ১০৬, ২০১৮ সালে ১১৪ এবং ২৪ সালে ১২৫ টি বাঘের তথ্য পাওয়া গেছে।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর ) সচিবালয়ে পরিবেশ, বন ও জরবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রনালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য তুলে ধরেন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়েছে, বাঘ সংরক্ষণে সরকার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। বাঘসহ সুন্দরবনের অন্যান্য বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণ ও প্রজননের উদ্দ্যেশে বনের ৫৩.৫২ শতাংশ এলাকাকে রক্ষিত এলাকা ঘোষণা করে সেখান থেকে সকল ধরণের বনজ সম্পদ আহরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বাঘ মানুষের দ্বন্দ্ব হাসে লোকালয় সংলগ্ন এলাকায় ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ নাইলনের ফেন্সিং তৈরি করা হচ্ছে। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সময় বাঘ ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীর আশ্রয়ের জন্য বনের ভিতরে ১২টি মাটির উচু কিল্লা/ডিবি নির্মাণ করা হয়েছে। বাঘের আক্রমণে নিহত ব্যক্তির পরিবারকে ৩ লক্ষ টাকা এবং গুরুতর আহত ব্যক্তিকে ১ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ বাবদ প্রদান করা হচ্ছে। বাঘ সংক্রান্ত অপরাধ উদ্ঘাটনে তথ্য প্রদানকারীকে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা সম্মানি প্রদান করা হচ্ছে। লোকালয়ে চলে আসা বাঘকে পুনরায় বনে ফিরিয়ে দেবার জন্য স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে ৪৯টি ভিলেজ টাইগার রেসপন্স টিম গঠন করা হয়েছে এবং টিমের সদস্যদেরকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। বাঘ সংরক্ষণে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতি বছর বিশ্ব বাঘ দিবস পালনসহ বিভিন্ন গণসচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণ অব্যাহত রয়েছে।
বাঘ বাংলাদেশের জাতীয় প্রাণী। আইইউসিএন কর্তৃক বাঘকে বাংলাদেশে অতি বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। ২০১০ সালে ১৩টি টাইগার রেঞ্জ কান্ট্রির মধ্যে বর্তমানে ১০ টি দেশে অর্থাৎ বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ভুটান, রাশিয়া, চীন থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, মালেশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় বাঘ রয়েছে। অবশিষ্ট ৩টি দেশ অর্থাৎ ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও লাওসের বনাঞ্চল হতে বাঘ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বিশ্বব্যাপী বর্তমানে বাঘের সংখ্যা মাত্র ৩৮৪০টি।
বাঘ জরীপের মাধ্যমে বাঘের প্রকৃত সংখ্যা নিরূপণ, বনে বাঘের বিচরণ ক্ষেত্র চিহ্নিতকরণের পাশাপাশি বাঘ সংক্রান্ত তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ পূর্বক বাঘ সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা কর্মকৌশল নির্ধারণ করা হয়ে থাকে। সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা নির্ণয়ের জন্য সর্বপ্রথম ২০১৫ সালে আধুনিক পদ্ধতি ক্যামেরা ট্রাপিং এর মাধ্যমে বাথ জরীপ করা হয় এবং উক্ত জরীপে বাঘের সংখ্যা পাওয়া যায় ১০৬ টি এবং প্রতি ১০০ বর্গ কিলোমিটারে বাঘের ঘনত্ব ছিল ২.১৭। ২০১৮ সালে ২য় পর্যায়ে ক্যামেরা ট্রাপিং এর মাধ্যমে সুন্দরবনের বাঘ জরীপে ১১৪টি বাঘ পাওয়া যায় এবং প্রতি ১০০ বর্গ কিলোমিটারে বাঘের ঘনত্ব ছিল ২.৫৫। ২০১৫ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে বাঘ বৃদ্ধি পায় ৮টি এবং বাঘ বৃদ্ধির শতকরা হার ছিল প্রায় ৮ শতাংশ।
সুন্দরবনে ক্যামেরা ট্রাপিং এর মাধ্যমে ৩য় পর্যায়ে বাঘ জরীপ সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে সুন্দরবন বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাস থেকে শুরু হয়ে ২০২৪ সালের মার্চ মাসে শেষ হয়। উক্ত বাঘ জরীপে সুন্দরবনের সাতক্ষীরা, খুলনা, চাঁদপাই ও শরনখোলা রেঞ্জে চারটি ব্লকে ৬০৫টি গ্রীডে স্বয়ংক্রীয় ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। ৪ বর্গকিলোমিটার আয়তনের প্রতিটি গ্রীডে বাঘের গতিপথ, বিচরণ, অবস্থান ইত্যাদি বিষয়ে পর্যবেক্ষণ করে সতর্কতার সাথে ০২টি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। ৬০৫টি গ্রীডে পর্যায়ক্রমে ১ হাজার ২১০টি ক্যামেরা মোট ৩১৮দিন রেখে দেয়া হয় এবং ৩৬৮টি গ্রীডের ক্যামেরায় বাঘের ছবি পাওয়া যায়। ১০ লক্ষাধিক ছবি ও ভিডিও থেকে শুধুমাত্র বাঘের ছবি পাওয়া যায় ৭ হাজার ২৯৭টি। এত বিপুল সংখ্যক বাঘের ছবি ইতঃপূর্বে পাওয়া যায়নি।