কৃষি সংবাদ প্রতিনিধি ময়মনসিংহ:
দেশের কৃষি ও প্রাণিসম্পদের উন্নয়নে সারা বছর কাজ করে ময়মনসিংহে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থী, শিক্ষকদের দল। সম্প্রতি দুটি গবেষণায় তাঁরা ছাগলের একটি উচ্চ উৎপাদনশীল সংকর জাত উদ্ভাবন করেছেন।
দেশীয় ব্ল্যাক বেঙ্গল ও দক্ষিণ আফ্রিকার বোয়ার জাতের ছাগলের সংকরায়ন করে ছাগলের নতুন একটি জাত উদ্ভাবন করেছেন পশু প্রজনন ও কৌলিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মো. রুহুল আমিনের নেতৃত্বে বাকৃবির একদল গবেষক। গবেষক জানান, ২০২১ থেকে ২০২৩ সালে পরিচালিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, জাতটি ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের মতো সহজেই লালন-পালন করা যায়। লালনপালন খরচ সমান হলেও নতুন এই জাতের বৃদ্ধি ব্ল্যাক বেঙ্গলের প্রায় দ্বিগুণ—পুরুষ ছাগল বছরে ২৬ কেজি ও স্ত্রী ছাগল ২৩ কেজি মাংস উৎপাদনে সক্ষম।
বছরে গড়ে পাঁচটি বাচ্চা দেয় একটি ব্ল্যাক বেঙ্গল। নতুন জাতেও এই বৈশিষ্ট্য বজায় থাকবে। প্রতিটি বাচ্চা প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকায় বিক্রি করা যাবে। এতে এক বছরে একজন খামারি পাঁচটি বাচ্চা থেকে আয় করতে পারবেন প্রায় এক লাখ টাকা। অন্যদিকে, ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের বাচ্চা থেকে বছরে সর্বোচ্চ আয় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা করে। পাঁচটি বাচ্চা থেকে বছরে আয় প্রায় ৬০ হাজার টাকা। ফলে নতুন জাতটি খামারিদের জন্য বছরে ৪০ হাজার টাকা অতিরিক্ত লাভের সুযোগ তৈরি করবে।
গবেষক আরও জানান, সংকর জাতের বাচ্চার ওজন ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের বাচ্চার ওজনের দ্বিগুণেরও বেশি। চামড়ার রং সাদা, কালো, বাদামি হওয়ায় এ জাতের ছাগল দেখতেও সুন্দর। সংকর জাতটির জিনে ৫০ শতাংশ ব্ল্যাক বেঙ্গল ও ৫০ শতাংশ বোয়ার জাতের বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের তুলনায় এগুলোর প্রজনন ক্ষমতা বেশি, মাংসের স্বাদও ভালো।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) গবেষক দল এই সংকট মোকাবিলায় বোয়ার জাতের পাঠার সঙ্গে দেশীয় ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের ছাগীর সংকরায়নের মাধ্যমে একটি নতুন জাত উদ্ভাবন করেছে। নতুন এই সংকর জাত ব্ল্যাক বেঙ্গলের সমপরিমাণ খাবারে দ্বিগুণ মাংস উৎপাদনে সক্ষম। পুরুষ ছাগল বছরে ২৬ কেজি এবং মাদি ছাগল ২৩ কেজি মাংস উৎপাদন করতে পারে। এ জাতটি রোগ প্রতিরোধী এবং ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের মতোই সহজে পালনযোগ্য। নতুন জাতের ছাগল দেখতে অত্যন্ত আকর্ষণীয়, কারণ এর চামড়ার রঙ সাদা-কালো। এ জাতের বাচ্চার জন্মের সময় গড় ওজন প্রায় ২ কেজি, যেখানে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলের বাচ্চার গড় ওজন মাত্র ৮০০ গ্রাম।
বাকৃবির পশুপালন অনুষদের পশু প্রজনন ও কৌলিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রুহুল আমিন এবং তার সহযোগী গবেষক স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী খালিদ সাইফুল্লাহ এই জাতটি উদ্ভাবন করেছেন। ময়মনসিংহের বিভিন্ন এলাকায় গবেষণার মাধ্যমে এর কার্যকারিতা যাচাই করা হয়। ফলাফল ছিল সন্তোষজনক।
অধ্যাপক রুহুল আমিন জানান, এই গবেষণার মূল লক্ষ্য কম খরচে মাংস উৎপাদন করা। কৃষককে দ্বিগুণ লাভবান করা। কিন্তু প্রজননের উদ্দেশ্যে নয়। গবেষণায় দেখা গেছে সংকরের স্ত্রী বাচ্চাদের প্রজনেন আসতে ১ বছর বয়সে বেশি সময় লাগে । অন্যদিকে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগীর ৬-৭ মাসেই প্রথম গর্ভধারণ করে। কৃষককে লাভবান এবং মাংসের চাহিদা পূরণে জাতীয় প্রজনন নীতিমালায় সহজ করার দাবি জানান।
বোয়ার জাতের ছাগল যার উৎপত্তি দক্ষিণ আফ্রিকায় । যা বছরে সর্বোচ্চ ৭০ কেজি মাংস উৎপাদনে সক্ষম। ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের কারণে এ জাতের ছাগল পরজীবী ও অনুজীবের প্রতি সংবেদনশীল হওয়ায় আমাদের দেশের সাথে মাননশীল নয়।
সহকারী গবেষক খালিদ সাইফুল্লাহ জানান, আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে কম খরচে ভোক্তার কাছে গুণগত মাংস পৌঁছে দেওয়া। খামারিরা এ জাত পালন করে বছরে প্রায় দ্বিগুণ মুনাফা করতে পারেন। কারণ একই পরিমাণ খাবার ও পরিচর্চার মাধ্যমে দ্বিগুণ মাংস পাওয়া যায় বোয়ার ও ব্ল্যাক বেঙ্গলের সংকর জাত থেকে। মাঠ পর্যায়ের গবেষণায়ও আমরা কাঙ্খিত ফলাফল পেয়েছি।
তবে একটি বিষয়ে সতর্কও করলেন গবেষক রুহুল আমিন, এই সংকর জাতকে প্রথম প্রজন্মেই সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। পরবর্তী প্রজন্মে ব্ল্যাক বেঙ্গলের বৈশিষ্ট্য কমে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। ব্ল্যাক বেঙ্গলের বৈশিষ্ট্য কমে গেলে জাতটি আর দেশের আবহাওয়া উপযোগী থাকবে না। তা-ও এই সংকর প্রজাতিকে ব্রয়লার মুরগির মতো টার্মিনাল প্রোডাক্ট (শুধু মাংস উৎপাদনের জন্য পালিত প্রাণী) হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। প্রজননের জন্য ব্ল্যাক বেঙ্গল ও বোয়ার জাতের ক্রস ব্রিডিং পদ্ধতিই অনুসরণ করতে হবে। প্রাপ্তবয়স্ক হলেই সংকর ছাগলকে মাংস সরবরাহের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যাবে।