সুমন ইসলাম
চাহিদার সঙ্গে যোগানের সামঞ্জস্য না থাকার কারণে প্রতি বছর আলুবীজ নিয়ে চলে একটা অব্যবস্থাপনা। সরকারিভাবে ও আমাদানির মাধ্যমে ৬৬ থেকে ৭০ হাজার টন আলুবীজ সরবরাহ করা হলেও বাকিটা চাষীদের অতিরিক্ত দামে কোল্ডস্টোরেজ থাকা পুরতন আলু থেকে যোগান দিতে হচ্ছে। চলতি বছর আণু চালের মৌসুম শুরু হলেও অভ্যন্তরীণ বাজারে আলুর দাম বেশি হওয়ায় চাহিদা অনুযায়ী আলুবীজ পাছেন না আলু চালীরা। জমি তৈরি করে রাখলেও প্রয়োজনীয় বীজের সংস্থান নিয়ে ব্যতি-ব্যস্থা থাকতে হচ্ছে চাষীদের। ফলে চলতি মৌসুমে কাঙ্খিত উৎপাদন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাজারে আলুর দাম বেশি হওয়ার কারণে বীজ আলু খাবার আলু হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এছাড়া বীজ আলুর সরবরাহেও রয়েছে ঘাটতি। ফলে আসন্ন আলুর উৎপাদন মৌসুমে ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, অক্টোবর শেষে দেশে বীজ আলুর মজুত ছিল ৫.৬৭ লাখ টন। আর বীজ আলুর চাহিদা ছিল ৭.৫ লাখ টন। অর্থাৎ ইতিমধ্যেই প্রায় ২ লাখ টন বীজ আলুর মজুত খাওয়ার আলু হিসেবে ব্যবহার হয়ে গেছে। একই সময়ে খাবার আলুর মজুত ছিল ৩.২০ লাখ টন।
বাংলাদেশ সিড অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব আলী আফজাল বলেন, বাজারে প্রতি কেজি খাবার আলু বিক্রি হচ্ছে ৭৫ টাকা বা তারও বেশি দামে। কিন্তু প্রকারভেদে বিভিন্ন কোম্পানি বীজ আলু বিক্রি করছে ৬৯ থেকে ৭৮ টাকা কেজি দরে। ফলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বীজ আলু খাবার আলু হিসেবে ব্যবহার হওয়ার। এমনটা হলে বীজ আলুর ব্যপক সংকট তৈরি হবে। দেশে বীজ আলু যা আছে, তা যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। চাষিদের কাছে অল্প কিছু বীজের জোগান থাকে। এর বাইরে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) ও বেসরকারি খাত বীজ আলুর জোগান দেয়। এছাড়া ২০-৩০ হাজার টন বীজ আমদানি হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমদানির বীজ ঠিক সময়ে দেশে না এলে সমস্যায় পড়তে হবে। ডলার সংকটের কারণে ঋণপত্র (এলসি) খুলতে যে সমস্যা হচ্ছে।
বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু বলেন, গত বছর আলুর উৎপাদন কম হয়েছে। সে কারণে বাজারে দাম বেশি। এই দাম বেশি হওয়ার কারণে এবারে অনেক বীজ আলু খাবার আলু হিসেবে ব্যবহার হয়েছে এবং হচ্ছে। কৃষি মন্ত্রণালয় অবশ্য বীজ আলুর যাতে যথাযথ সরবরাহ সংরক্ষণ করা যায়, সেজন্য আমাদেরকে নির্দেশনা দিয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) এর আলু বীজ বিভাগের ব্যবস্থাপক মো. আলতাফ হোসেন জানান, দেশে আলু বীজের অনেক চাহিদা থাকার পরেও সরকারি ভাবে ডিলারের মাধ্যমে বীজ সরবরাহ করা হয়ে থাকে। তবে বাজারে আলুর দাম বেশি হওয়ার কারণে চাষূদের মধ্যে কিছুটা হতাশা দেখা গেছে। অনেক জায়হায় বেশি দামে বীজ কেনার খবর পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে আমারা সবজায়গায় মনিটরিং ব্রবস্থা জোড়দার করেছি। যদি কোনো ডিলার বেশি দামে বীজ বিক্রি করে তাহলে তার লাইসেন্স বাতিল করা হবে। এ বছর বিএডিসি ৩৬ হাজার টন আলুবীজ সরকরাহ করছে।
বিএডিসির তথ্য অনুযায়ী, রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম জেলায় আলু চাষের জমি বেড়েছে প্রায় ৯ হাজার ২০২ হেক্টর। উল্টো ছয় বছরে বীজের সরকারি বরাদ্দ কমেছে প্রায় ১ হাজার ৪২৮ দশমিক ৭৫৯ টন। দেশে সবচেয়ে বেশি আলু উৎপাদন হয় রংপুর বিভাগে। চলতি মৌসুমে এ অঞ্চলের পাঁচ জেলায় আলুবীজের সম্ভাব্য চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ লাখ ৬৭ হাজার টন। সেখানে সরকারি বরাদ্দ মাত্র ২ হাজার ৭৯৭ দশমিক ৩২ টন বিএডিসি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ উইংয়ের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১২ নভেম্বর পর্যন্ত ৪.৫৫ লাখ টন আলু আমদানির অনুমতিপত্র দেওয়া হয়েছে। এর বিপরীতে আমদানি হয়েছে মাত্র ৪১ হাজার টন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, গত বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশ রপ্তানির পরিবর্তে নিয়মিত আমদানি করেও বাজার সামাল দিতে পারছে না। শুধু বীজ আলু নয়, খাবার আলুর সংকটও প্রকট হয়েছে। দুই দফা বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণে এবারে কৃষক আগাম আলু রোপণ করেছেন কম পরিমাণে। প্রতি বছর নভেম্বর মাসে আগাম নতুন আলু বাজারে এলেও এ বছর এর পরিমাণ খুবই সামান্য।
ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) বাজার বিশ্লেষণের হিসাবে, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ বছর এখন আলুর দাম ৩৫ শতাংশ বেশি। এই পরিস্থিতিতে বীজ আলুর সংকট নিয়ে ১২ নভেম্বর কৃষি মন্ত্রণালয়ে সচিবের সভাপতিত্বে একটি সভা হয়েছে। ওই সভায় সরকারি-বেসরকারি খাতের সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন। সভায় বীজ আলু ও খাবার আলুর তথ্য নিয়ে পর্যালোচনা হয়। এখন প্রকৃতপক্ষে বীজ আলু কত আছে, তার প্রকৃত তথ্য প্রদান এবং বীজ আলু যাতে কোনোভাবেই খাবার আলু হিসেবে ব্যবহার না করা হয়, সে বিষয়ে কৃষি বিভাগকে সতর্ক নজরদারি করতে নির্দেশনা দেওয়া হয় সভায়।
সভায় কৃষি সচিব মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বীজ আলুর যথাযথ সংরক্ষণ ও সঠিক হিসাব দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রদানের নির্দেশনা দেন। একইসঙ্গে বীজ আলু যাতে অন্য কোনো খাতে ব্যবহার না হয়, সে বিষয়ে কৃষি বিভাগকে তদারকি জোরদারের নির্দেশ দেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোল্ড স্টোরেজগুলোতে বর্তমানে আলুর মজুত রয়েছে ২ লাখ টনের কিছু বেশি, যা দিয়ে হয়তো ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত চলবে। তবে ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে বাজারে আগাম আলুর ভালো সরবরাহ আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।
দেশে বর্তমানে আলুর বার্ষিক চাহিদা ৭৫-৮০ লাখ টন। এর মধ্যে আলুর সংগ্রহ-পরবর্তী ক্ষতি হয় প্রায় ১০-১৫ শতাংশ। সে হিসাবে বছরে আলু উৎপাদনের চাহিদা রয়েছে প্রায় ৯০-৯৫ লাখ টন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে আলু উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ৪ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৬ টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৪.৫৭ লাখ হেক্টর জমিতে আলু চাষ করা হয়; যেখানে উৎপাদন হয়েছে ১.০৬ কোটি টন। যদিও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে শুরুতে তা ছিল ১ কোটি ১২ লাখ টন। এরপর বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় সরকারি হিসাবের চেয়ে প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ আলু উৎপাদন কম হয়েছে। এ কারণে বছরের শেষদিকে বাজারে অস্থিতিশীলতা শুরু হয়েছে।