কৃষি সংবাদ প্রতিবেদক:
কৃষকের উৎপাদিত ফসলের জন্য ন্যুনতম মূল্যনির্ধারণ ও মূল্য কমিশন গঠণের দাবি জানিয়েছে খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক- খানি।
আজ বুধবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রান্তিক কৃষকদের দীর্ঘদিনের মূল্যবঞ্চনার চিত্র এবং সম্প্রতিমেহেরপুরের পেঁয়াজচাষী সাইফুল শেখের মর্মান্তিক আত্মহত্যার ঘটনায় সরেজমিন তথ্যানুসন্ধানে প্রাপ্ততথ্য জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরার সময় এই দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে এ ছাড়াও সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান ও চালের মতো অন্যান্য ফসল সরাসরি ক্রয়ের উদ্যোগ গ্রহণ, কৃষিজোন ভিত্তিক কমিউনিটি সংরক্ষণাগার এবং হিমাগার তৈরির উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে কৃষকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে। সংগঠনের পক্ষ থেকে এসব দাবি তুলে ধরেন সংগঠনের সভাপতি কৃষিবিজ্ঞানী ড. জয়নুল আবেদীন।
খানি সভাপতি কৃষিবিজ্ঞানী ড. জয়নুল আবেদীন বলেন, আমাদের দরকার এমন সংস্কার যেখানে উৎপাদক এবং ভোক্তা উভয়ই লাভবান হয়। এই সংস্কারের জন্য আমাদের দরকার একটি সামগ্রিক প্রচেষ্টা। তবে নেতৃত্বটা সরকারকেই দিতে হবে। আমরা হয়তো একটা কেস নিয়ে কথা বলছি। কিন্তু আরও কতঘটনা আছে যা আমাদের দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং ও স্ট্যাটিটিক্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোশাহিদা সুলতানা বলেন, সম্প্রতি সরকার যে সংস্কার কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশ করেছে তাতে কৃষির বিষয় উঠে আসেনি। এমনকি এবার ধানের যে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে তা গ্রহণযোগ্য নয়। সরকার যে পরিমাণ ধান কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তাও কেনেনি। কৃষকদের বঞ্চনা থেকে রক্ষা করতে আমাদের কিকি বিষয়ে সংস্কার প্রয়োজন তা চিহ্নিত করতে হবে এবং তা সংস্কারের আওতায় আনতে হবে।
খানির সহসভাপতি রেজাউল করিম সিদ্দিকী বলেন, ফসল যখন কৃষকের ঘরে থাকে তখন এর দাম থাকে না, কিন্তু ফসল যখনই মহাজনের হাতে যায় তখনই দাম বেড়ে যায়। কৃষক যখন পেশা পরিবর্তন করে ভ্যান চালানো শুরু করে, তাকি আত্মহত্যা নয়? দেশে মসলাচাষে কৃষি ঋণে সুদেরহার ৪শতাংশ। কিন্তু কৃষকেরা জটিলতার ভয়ে ঋণদাতা সংস্থা থেকে এরচেয়েও বেশিসুদে ঋণ নিচ্ছে। আর এনজিওগুলোও মৌসুমি ঋণ না দিয়ে নিয়মিত ঋণ দেয়। এতে করে কৃষকেরা ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ে।
পেঁয়াজ চাষে লোকসান এবং ঋণ পরিশোধ করতে না পারার চাপে মেহেরপুর মুজিবনগরের পেঁয়াজ চাষী সাইফুল শেখ নিজজমিতে বিষপাণে আগ্মহত্যা করেন। সংবাদ সম্মেলনে তার মেয়ে রোজেফা খাতুন বলেন, পেঁয়াজ চাষী সাইফুল শেখের মেয়ে রোজেফা খাতুন তার বাবার আত্মহত্যার কারণ হিসেবে চাষাবাদে আর্থিক ক্ষতির ফলে সৃষ্ট গভীর হতাশা ও মানসিক দুশ্চিন্তার কথা উল্লেখকরেন এবং এই ঘটনার পর তাদের পরিবারের চরম দুর্দশার চিত্র তুলে ধরেন।
রোজেফা খাতুন বলেন, আমার বাবা বিভিন্ন ঋণদাতা সংস্থা ও সারের দোকান থেকে ঋণ নিয়ে পেঁয়াজ চাষ করেছিলেন। দুইবিঘা জমিতে চাষ করতে যেখানে আমার বাবার দেড়লাখ টাকা খরচ হয়েছিল, সেখানে তিনি বিক্রি করে পেয়েছিলেন মাত্র ৫৮ হাজার টাকা। শ্রমিকের খরচ দেওয়ার পর আর কতটাকাই থাকে? আমার বাবা প্রতিমণ পেঁয়াজ বিক্রি করেছিলেন ৬০০ টাকায় অথচ এখন বাজারে পেঁয়াজের দাম ২০০০ টাকা। আমার বাবার মতো কৃষকেরা যদি লোকসানের হতাশায় আত্মহত্যা করেন, তাহলে মানুষের মুখে খাবার তুলে দিবে কে? আমার সরকারের কাছে অনুরোধ শ্রমিকের অধিকার কৃষকের অধিকার নিশ্চিত করবেন। যেন আর কেউ তার বাবা না হারায়।
কৃষকের আত্মহত্যা ঘটনাপরে খানি বাংলাদেশ সদস্য সংগঠন, বেসরকারি উন্নয়নসংস্থার প্রতিনিধি, কৃষিগবেষক, লেখক ও সাংবাদিক সমন্বিতএকটি তথ্যানুসন্ধানদল ভুক্তভোগীপরিবার, স্থানীয়কৃষক এবং স্থানীয় প্রশাসনেরসাথে সাক্ষাৎ করে মাঠ পর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ করেন। এই পরিদর্শন, প্রত্যক্ষপর্যবেক্ষণ এবং ভুক্তভোগীর পরিবার, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সরকারিদপ্তরসহ অন্যান্যদের সাথে সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে উঠে আসা প্রান্তিক কৃষকদের অসহনীয় বাস্তবতারচিত্র এই সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা হয়।
বক্তারা বলেন, কৃষকের উৎপাদিত পণ্যেরন্যায্যমূল্য না পাওয়ার দীর্ঘদিনের চিত্র এবং এর পেছনের কারণ হিসেবে ফড়িয়াবাজি, সিন্ডিকেট, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য, পর্যাপ্ত সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাব, দুর্বল বিপণন ব্যবস্থা, নীতিনির্ধারকদের মনযোগের অভাব এবং এক্ষেত্রে সরকারি উদাসীনতাকে প্রধানকারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন। আলোচনায় ধান ও চাল ব্যতীত অন্যান্য কৃষিপণ্য সরকারিভাবে সংগ্রহ না করা এবং খাদ্যশস্য সংগ্রহে বিদ্যমান অস্বচ্ছ পদ্ধতির কারণে কৃষকদের নিয়মিত প্রতারিত হওয়ার বিষয়টিতেও বিশেষভাবে আলোকপাত করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যদের মধ্য উপস্থিত ছিলেন – ইনসিডিন বাংলাদেশের মুশফিক সাব্বির, একশন এইড বাংলাদেশের ডেপুটি ম্যানেজার অমিত রঞ্জন দে, পার্টি সিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাকশন নেটওয়ার্ক- প্রাণের নির্বাহী প্রধান নুরুল আলম মাসুদ প্রমুখ।