কৃষি সংবাদ প্রতিবেদক:
নির্যাতনের শিকার নারীদের প্রায় ৬৪ শতাংশই সহিংসতার কথা কাউকে কখনো বলেননি। অর্াৎ সুনাম রক্ষা, সন্তানদের ভবিষ্যৎ, এ ধরনের সহিংসতা স্বাভাবিক মনে করে নীরবে সহ্য করেন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) বাংলাদেশের সমন্বয়ে প্রকাশিত নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ-২০২৪ এ এমন তথ্য উঠে এসেছে। সম্প্রতি জরিপের ফলাফল প্রকাশিত হয়।
জরিপ বলছে, প্রযুক্তির সহায়তায় নারী নির্যাতন বাড়ছে। নানা ডিভাইসের মাধ্যমে সংবেদনশীল ব্যক্তিগত ছবি বা অযাচিত অন্তরঙ্গ মেসেজের মাধ্যমে বাড়ছে নারী নির্যাতন। অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবেও নারী নির্যাতন করা হচ্ছে। দরিদ্রতাসহ নানা কারণে সব সময় শহরের চেয়ে নারী নির্যাতনের হার বেশি থাকে গ্রামে। কিন্তু সেই চিত্রেরও পরিবর্তন হয়েছে। আর্থিকভাবে সচ্ছলতা এলেও কমেনি নারী নির্যাতন।
বিবিএস ও ইউএনএফপিএ-এর তথ্য অনুযায়ী, নারী আয় করলেও সেই টাকায় কর্তৃত্ব থাকে পুরুষের। গ্রামের সঙ্গে এক ধরনের পাল্লা দিয়ে শহরেও বেড়ে চলেছে নারী নির্যাতনের হার। দেশে জাতীয়ভাবে জীবনে একবার হলেও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন দেশের ৭৫ দশমিক ৯ শতাংশ নারী। এই হার শহরে ৭৫ দশমিক ৬ শতাংশ ও গ্রামে ৭৬ শতাংশ। ফিজিক্যাল, সেক্সুয়াল, ইমোশনাল, কন্ট্রোলিং বিহ্যাভিয়ার, ইকনোমিক ভায়োলেন্স মিলিয়ে দেশে ৭৫ দশমিক ৯ শতাংশ নারী নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল বাংলাদেশের সমন্বয়ে প্রকাশিত নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ-২০২৪ এর মূল ফলাফল উপস্থাপন করেন বিবিএসের প্রকল্প পরিচালক ইফতেখারুল করিম। জরিপটি তৈরিতে দ্বৈবচয়নের ভিত্তিতে দেশের ২৭ হাজার ৪৭৬ জন নারীর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। সময়কাল ছিল ২১ দিন।
গ্রাম ও শহরে নারী নির্যাতনের হার সমানতালে থাকা প্রসঙ্গে প্রকল্পের পরিচালক ইফতেখারুল করিম বলেন, শহরায়নের ফলে গ্রাম ও শহরে নারী নির্যাতনের হার সমান। নারী নির্যাতনের ধরনও পাল্টেছে। প্রযুক্তির সহায়তায় নারী নির্যাতন বাড়ছে। নানা ডিভাইসের মাধ্যমে সংবেদনশীল ব্যক্তিগত ছবি বা অযাচিত অন্তরঙ্গ মেসেজ আদান-প্রদানের মাধ্যমে বাড়ছে নারী নির্যাতন। অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবেও নারী নির্যাতন করা হচ্ছে।
আর্থিকভাবে নারী নির্যাতন প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক বলেন, অনেক সচ্ছল স্বামী নারীর প্রয়োজন অনুসারে হাত খরচ দেন না। স্ত্রী চাইলো পাঁচ হাজার, দেওয়া হলো এক হাজার। এছাড়া নারী আয় করলেও টাকা খরচের দায়িত্ব থাকে স্বামীর হাতে। ফলে আর্থিকভাবে নারীরা এক ধরনের সহিংসতার শিকার হচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, সহিংসতার শিকার ৬৪ শতাংশ নারী কিন্তু নীরব থাকেন। সমাজের ভয়ে, পরিবারের কথা চিন্তা করে বাচ্চাদের কথা চিন্তা করে তারা কথা বলেন না।
যৌন নির্যাতন বেশি বরিশালে
জরিপে দেখা যায়, বরিশাল বিভাগে যৌন নির্যাতনের ঘটনা বেশি, ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ। বরিশালের পরেই যৌন নির্যাতন বেশি হয় চট্টগ্রাম বিভাগে ৩৪ দশমিক ১ শতাংশ। এছাড়া খুলনায় ২৯ দশমিক ৯, ঢাকায় ২৭ দশমিক ৮, রাজশাহীতে ২৭ দশমিক ২, ময়মনসিংহে ২৩ শতাংশ, রংপুরে ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ ও সিলেটে যৌন নির্যাতনের হার ২৮ দশমিক ২ শতাংশ।
শহর ও গ্রাম পার্থক্য কম
শহর ও গ্রামে যৌন নির্যাতনের হারে খুব বেশি পার্থক্য নেই। শহরে যৌন নির্যাতনের হার ৩১ দশমিক ১ এবং গ্রামে ২৮ শতাংশ। গত ১২ মাসেও যৌন নির্যাতন বেশি হয়েছে বরিশালে। এসময় জাতীয় পর্যায়ে দেশে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৯ দশমিক ৪ শতাংশ নারী। সেখানে বরিশালে এর হার ১৩ দশমিক ২ শতাংশ। এর পরেই চট্টগ্রামে ১১ দশমিক ২ শতাংশ।
এছাড়া ঢাকায় ৮ দশমিক ৭ শতাংশ, খুলনায় ৯ দশমিক ১ শতাংশ, ময়মনসিংহে ৭ দশমিক ৬ শতাংশ, রাজশাহীতে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ, রংপুরে ৯ দশমিক ১ শতাংশ এবং সিলেটে ১০ দশমিক ৭ শতাংশ নারী যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। গত ১২ মাসে গ্রামে ৮ দশমিক ৯ শতাংশ এবং শহরে ১০ দশমিক ৫ শতাংশ নারী যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
নারীর প্রতি আর্থিকবৈষম্য বিষয়ে ড. উম্মে বুশরা ফাতেহা সুলতানা বলেন, নারী যখন আয় করেন তখন খরচের সিদ্ধান্ত নেন পুরুষ সদস্যরা। এটা অনেক দিন ধরে হচ্ছে। নারীর আয় স্বামী নিয়ে নেয়। না দিলে স্বামী অনেক সময় মারধর করে। তবে পুরুষের মাসে আয় কত তা জানার জন্য স্ত্রী সাহসও করেন না। স্ত্রী ভাত-কাপড় পাচ্ছেন এটাই তাদের কাছে অনেক কিছু।
নারী নির্যাতনের শীর্ষে স্বামী
বাংলাদেশের অধিকাংশ নারীই জীবনসঙ্গী বা স্বামীর মাধ্যমে সহিংসতার শিকার হন, যা একজন নারীর জীবনে গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। জরিপে দেখা যায়, দেশের ৭০ শতাংশ নারী অন্তত একবার হলেও স্বামীর মাধ্যমে শারীরিক, যৌন, মানসিক এবং অর্থনৈতিক সহিংসতার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণের শিকার হন। যেখানে গত ১২ মাসে এ ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছেন ৪১ শতাংশ নারী।
জরিপটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- সহিংসতার ঝুঁকির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য তারতম্য, যেমন- দুর্যোগপ্রবণ এলাকার নারী এবং বিগত ১২ মাসের মধ্যে অদুর্যোগপ্রবণ এলাকার নারীদের তুলনায় জীবনসঙ্গী বা স্বামীর দ্বারা বেশি মাত্রায় সহিংসতার সম্মুখীন হয়েছেন।
জরিপে আরও উঠে এসেছে, যদিও স্বামী বা জীবনসঙ্গীর মাধ্যমে সহিংসতার বিস্তৃতি এখনো ৭০ শতাংশে, অর্থাৎ উচ্চমাত্রায় রয়েছে, তবে বিগত ১২ মাসে এ হার ৪১ শতাংশ। যেখানে ২০১৫ সালের হার ছিল ৭৩ শতাংশ এবং তখন ১২ মাসের হার ছিল ৫৫ শতাংশ। জরিপটিতে নন-পার্টনার সহিংসতার চেয়ে জীবনসঙ্গী বা স্বামীর মাধ্যমে সহিংসতা বিস্তারের মাত্রা বেশি হিসেবে উঠে এসেছে।
সঙ্গী নন (নন-পার্টনার) এমন ব্যক্তির মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার হন ১৫ দশমিক ৮ শতাংশ নারী। শহরে এই হার ১৭ দশমিক ৩, যা গ্রামে ১৫ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ, শহরের নারী নন-পার্টনারের মাধ্যমে বেশি নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।
ঢাকায় এই নির্যাতনের হার ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ। এরপরই রয়েছে চট্টগ্রাম। সেখানে ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ নারী নন-পার্টনারের মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার হন।
জরিপে বলা হয়, ‘নন-পার্টনার’ শব্দটি এমন যে কোনো ব্যক্তির জন্য ব্যবহার করা হয় যাকে সেই দেশ বা প্রেক্ষাপটে ‘সঙ্গী’ বলতে যেভাবে বোঝায় সে অনুযায়ী ‘সঙ্গী’ বলে মনে করা হয় না। নন পার্টনার বলতে তাই বাবা-মা, শ্বশুর-শাশুড়ি, আত্মীয়, বন্ধু, প্রতিবেশী, সহকর্মী, পরিচিত ও অপরিচিতদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
নন-পার্টনারের মাধ্যমে নির্যাতনের হার কম রাজশাহী বিভাগে ৯ দশমিক ৬ শতাংশ। এছাড়া বরিশালে ১৫ দশমিক ৮, খুলনায় ১৫ দশমিক ৭, ময়মনসিংহে ১৫ দশমিক ৯, রংপুরে ১৪ দশমিক ৮ ও সিলেটে এর হার ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ।
নারী নির্যাতন কমাতে সবার আগে মানুষের মন মানসিকতার পরিবর্তন দরকার। নারী নির্যাতনের তথ্য-উপাত্ত সমন্বিত হওয়ার দরকার বলে মত দিয়েছে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়।