সুমন ইসলাম :
আমরা সবাই কাজু বাদামকেই পুষ্টির আধার হিসেবে মনে করি। কিন্তু যে মাধ্যমে কাজু বাদাম পেয়ে থাকি সেই কাজু আপেলেও রয়েছে বেসুমার পুষ্টি গুন। আমাদের সপ্তাহে ৩-৪ দিন পরিমিত কাজু বাদাম খাওয়া দরকার। কাজু আপেল স্বাদে মিষ্টি এবং এতে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পানি থাকে। গাছ থেকে পাকা আপেল পেরে সহজে খাওয়া যায়। পাহাড়িরা সতেজ পাকা আপেল কেটে লবণ-মরিচের গুড়া মিশিয়ে খেতে বেশ পছন্দ করে। কাজু বাদাম তরকারী হিসেবে রান্না করে খাওয়া যায়। ভিনেগারের সাথে মিশিয়ে গাঁজন করে এলকোহল পানীয় হিসেবে তৈরি করে অনেক দেশে পান করা হয়। আগামী বছর ‘কাজু এন্ড কফি এগ্রো’ দেশের বাজারে নিয়ে আসছে পুষ্টিগুন সমৃদ্ধ কাজু আপেল ড্রিংক। এমটাই জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান মো. ওয়াজেদুল ইসলাম মবিন।
প্রতিষ্ঠানটির গবেষক এমডি মাহতাব আলী বলেন, আমাদের দেশে এক মাত্র আমরাই কাজু আপেল নিয়ে কাজ করছি। আমরা এখন আমাদের পরীক্ষা নিরীক্ষার মধ্যেই আছি। তবে এখন পর্যন্ত যে ফলাফল এসেছে তাতে আমরা সন্তুষ্ট। কাজু আপেল দিয়ে ভারত, তানজানিয়া, মোজাম্বিক ও ব্রাজিলে এলকোহল পানীয় তৈরি করা হয়। ভারত ও পাকিস্থানে বিভিন্ন মিষ্টি তৈরি, বরফি ও কোরমা তৈরিতে কাজু আপেল ও বাদাম ব্যাবহার করা হয়। মোজাম্বিকে কাজু কেক তৈরিতে এবং থাইল্যান্ড ও চীনে রান্নায় তরকারী হিসেবে এর ব্যাপক ব্যাবহার হয়। কাজু আপেল প্রতি ১০০ গ্রামে প্রায় ২৬ মি. লি. গ্রাম ভিটামিন সি সাথে যা কমলা থেকে প্রায় ৫-৬ গুণ বেশি। অনেক দেশে মূল্যবান জুস হিসেবে পান করা হয়। কাজু আপেলে প্রচুর পরিমানে চিনি, আয়রন, ফসফরাস, ক্যালসিয়াম বিদ্যমান। দেহের ফ্যাট ও কার্বহাইড্রেট দহনে কাজু জুস ভুমিকা রাখে। এতে দুটি এন্টিঅক্সিডেন্ট থাকে যা মানব দেহের জন্য বেশ উপকারি। কাজুবাদামের উপরে কাজু ফল বা কাজু আপেল থাকে। কোন কোন জায়গায় এ ফল গোখাদ্য হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। কাজু লিকার অসুস্থতা, ঠান্ডা, ফ্লু, দাতের ব্যাথা, শরীর ব্যাথা, লো-ব্লাড প্রেসার, বয়স্কদের ঘুমের ব্যাঘাত ও ডায়রিয়াতে ভালো কাজ করে।
কাজু বাদাম প্রকল্প সূত্র জানায়, ভিটামিন সি, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, আয়রন, পটাসিয়াম, ফসফরাস এবং তামার মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পদার্থে ভরপুর। ফ্ল্যাভোনয়েড, অ্যান্থোসায়ানিন, ফ্ল্যাভোন, ক্যারোটিনয়েড, লুটেন এবং জিয়াজান্থিনের মতো শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে। এটি ফাইবার সমৃদ্ধ একটি ফল যা হজম প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে। এতে অ্যানাকার্ডিক, গ্যালিক এবং কনজুগেট সিনামিক অ্যাসিডের মতো জৈব অ্যাসিড থাকে। কাজু আপেলের ফাইবার, প্রোটিন এবং স্বাস্থ্যকর চর্বি হার্টের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে। এতে থাকা ফ্ল্যাভোনয়েড (যেমন, মাইরিসেটিন এবং কোয়ারসেটিন) ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হতে পারে। এটি ওজন কমানোর ক্ষেত্রেও কার্যকর ভূমিকা রাখে। এটি ক্যালসিয়াম এবং ম্যাগনেসিয়ামের মতো খনিজ উপাদানের উৎস হওয়ায় হাড়ের স্বাস্থ্য বজায় রাখতে সহায়ক। এতে থাকা ফাইবার হজম প্রক্রিয়াকে উন্নত করে এবং পেটের আলসার বা গ্যাস্ট্রাইটিসের মতো সমস্যা প্রতিরোধে সহায়ক। সুস্থ্য সবল থাকার জন্য খাদ্য তালিকায় কাজু বাদাম ও কাজু আপেলের পণ্য যোগ করা জরুরী।
কাজুবাদাম ও কফি গবেষণা, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক শহিদুল ইসলাম বলেন, বিশ্বব্যাপী কাজু বাদামের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশেও প্রতিদিন বাড়ছে চাহিদা। পাশাপাশি এই বাদাম চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন অনেকে। ইতোমধ্যে অনেকেই পাহাড়ী অঞ্চলে পাহাড় লীজ নিয়ে শুরু করেছেন বাণিজ্যিক বিত্তিকে কোশোনাট বা কাজু বাদাম চাষাবাদ। প্রতি বছর প্রায় ৩-৪ হাজার টন কাজু উৎপাদন হচ্ছে। তবে এর থেকে প্রায় ২০ গুন বা ৮০ হাজার টন উৎপাদন হয়ে থাকে কোশো আপেল বা কাজু আপেল। পাহাড়িরা এ থেকে কিছুটা রস করে পান করলেও অধিকাংশই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ দেখে একজন উদ্যোক্তা ওয়াজেদুল ইসলাম মবিন। কোশো আপলে থেকে জুস তৈরির আগ্রহ প্রকাশ করেন। মবিন বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইসারি ইউনিয়নে একশ একর জমিতে ‘কাজু এন্ড কফি এগ্রো’ গড়ে তুলেছেন। তার ভাবনা থেকেই আমরা বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে কাজ করছি। আমরা জুসের ওপরে একটি প্রটোকল বের করার জন্য চেষ্টা করছি। কোশা আপেল বা কাজু আপেল নিয়ে গবেষণা করছে ‘কাজু এন্ড কফি এগ্রো’। তিনি জেনেছেন আগামী বছর কোশা আপেল উৎপাদন মৌসুম থেকে ‘কাজু এন্ড কফি এগ্রো’ তাদের উৎপাদিত পণ্য (কাজু আপেল জুস) বাজারজাত শুরু করবে।
এ বিষয়ে ‘কাজু এন্ড কফি এগ্রো’- এর প্রধান মো. ওয়াজেদুল ইসলাম মবিন বলেন, বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইসারি ইউনিয়নে একশ একর জমিতে তাদের কাজুর বাদামের বাগান রয়েছে। বর্তমানে এ বাগানে ১৫ হাজার গাছ রয়েছে। গত বছরই প্রথম ফলন এসেছে। চলতি বছর প্রায় ১০০ টন বাদাম পেয়েছে তার প্রতিষ্ঠান। বাগানে গাছের বয়স কম মাত্র চার বছর। গাছের বয়স ৭ বছর হলে পরিপূর্ণ ফলন পাওয়া যাবে। এ হিসেবে আগামীতে তার বাগানের উৎপাদন বহুগুন বৃদ্ধি পাবে। ইতোমধ্যে তারা তাদের বাগানে উৎপাদিত কেশো আপেল বা কাজু আপেল নিয়ে গবেষণা করছেন। গবেষণায় তারা ভালো ফলাফল পেয়েছেন। তারা কোনো রকম প্রিজারভেটিভ ছাড়া এবং রাসায়নিক মুক্ত শক্তিবর্ধক কিছু ভিটামিন জুস তৈরি করছেন। যে গুলো পরীক্ষায় ভালো ফলাফল দিচ্ছে। আশা করছেন, আগামী বছর থেকে তারা তাদের দুটি জুস বাজারজাত করতে পারবেন। নাম দেওয়া হয়েছে কাজু রিলাক্স ড্রিংক এবং কাজু বৈরাগি ড্রিংক।দাম ও নাগালের মধ্যে রয়েছে, পেট বেতল-৫০ টাকা এবং ক্যান-১০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
মবিন আরো বলেন, আমাদের বাগানে কম্বোডিয়ান এম টুয়েন্টি থ্রি জাতের চারা লাগানো হয়েছে। এই জাতের কাজু বাদাম সব চেয়ে উন্নত এবং মজাদার। সব চারা কম্বোডিয়ান এম টুয়েন্টি থ্রি জাতের। ডিসেম্বর জানুয়ারি থেকে গাছে ফুল আসা শুরু হবে এরপর এপ্রিল এবং মে মাসের দিকে বাদাম ও আপেল তোলা শুরু হবে।