কৃষি সংবাদ প্রতিবেদক:
দেশের ২৬৩ টি সংকটাপন্ন প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। দেমের ৪ হাজার প্রজাতির উদ্ভিদের মধ্য থেকে ১০০০ প্রজাতির উদ্ভিদ মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
সোমবার সচিবালয়ে ‘বাংলাদেশে উদ্ভিদের লাল তালিকা বই (দেশের বিভিন্ন উদ্ভিদ প্রজাতি এবং তাদের সংরক্ষণ অবস্থা নিয়ে একটি ব্যাপক সংকলন’ বিষয়ক প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।
বাংলাদেশ বন অধিদপ্তরের টেকসই, বনও জীবিকা (সুফল) প্রকল্পের আর্থিক সহায়তায় বাংলাদেশের ন্যাশনাল হারবেরিয়াম ও আইইউসিএন বাংলাদেশ কর্তৃক এর কারিগরী সহায়তায় বাংলাদেশের এক হাজার উদ্ভিদের একটি লাল তালিকা (রেড ডাটা) প্রণয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। প্রায় শতাধিক বিশেষজ্ঞ ও গবেষকের তিন বছরের প্রচেষ্টায় এই লাল তালিকটি প্রনয়ন হয়েছে যা উদ্ভিদ প্রজাতির বর্তমান অবস্থার সম্পর্কে বিষয়ে ধারণা দেয়। এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের ১০০০ প্রজাতির উদ্ভিদের মূল্যায়ন করা এবং আইইউসিএন এর রেড লিস্ট মানদন্ড প্রয়োগ ও তা অনুসরণ করে উদ্ভিদের একটি রেড লিস্ট প্রণয়ন করা। এই মূল্যায়নের মাধ্যমে জাতীয় উদ্ভিদ রেড লিস্ট সূচক (RLI) চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে, যার টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (SDG) এর প্রতিবেদন প্রস্তুতির জন্য একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ (এসডিজি, লক্ষ্য ১৫ এর লক্ষ্য ১৫.৫.১)। উদ্ভিদ রেড লিস্ট সূচক (RLI) প্রজাতি গুলোর সম্মিলিত বিলুপ্তির ঝুঁকি (“সংরক্ষণ অবস্থা”) এর প্রবণতাগুলি পরিমাপ করে যা জীববৈচিত্র্যের অবস্থার পরিবর্তনের একটি সূচক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিশ্বব্যাপী সরকারসমূহ এই সূচকটি ব্যবহার করে থাকে তাদের জীববৈচিত্র্য হ্রাসের লক্ষ্যমাত্রা পূরণের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে।
সংবাদ সম্মলেন জানানো হয়েছে, ১০০০ উদ্ভিদের মধ্যে ২৭১ টি প্রজাতিকে ন্যূনতম বিপদগ্রস্থ, যা প্রকৃতিতে ভাল অবস্থায় আছে বুঝায়, ২৫৬ টি প্রজাতিকে অপ্রতুল তথ্য, এসব প্রজাতির তথ্যেও অভাব এবং বাকি ৩৯৫ টি প্রজাতিকে সম্মিলিতভাবে বিপদাপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই বিপদ-আপন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে পাঁচটি মহাবিপন্ন, ১২৭ টি বিপন্ন এবং ২৬৩ টি সংকটাপন্ন প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত। মোট ৭০ টি প্রজাতিকে প্রায় বিপদগ্রস্ত এবং সাতটি প্রজাতিকে আঞ্চলিকভাবে বিলুপ্ত হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। এছাড়া একটি প্রজাতির বন্য পরিবেশ বিলুপ্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছে।
বাংলাদেশের উদ্ভিদের রেড লিস্ট নীতিনির্ধারক, বিজ্ঞানী ও সংরক্ষণবিদদের জন্য একটি অপরিহার্য তথ্য ভান্ডার হিসেবে কাজ করবে, যা আমাদের উদ্ভিদ প্রজাতির সংরক্ষণ অবস্থা সম্পর্কে একটি বিস্তৃত ধারণা প্রদান করে। সবচেয়ে সংবেদনশীল ও বিপন্ন উদ্ভিদগুলো চিহ্নিত করার মাধ্যমে এই তালিকা আমাদের সংরক্ষণ প্রচেষ্টাগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে, সম্পদের কার্যকর বরাদ্দ নিশ্চিত করতে এবং তাদের হুমকি মোকাবেলায় লক্ষ্যভিত্তিক কৌশল উন্নয়নের সহায়তা করে। “The Encyclopedia of Flora and Fauna of Bangladesh” অনুসারে এতে ৩৮১৩ টি উদ্ভিদ প্রজাতি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে যেগুলোর এখনও যেসব প্রজাতির লাল তালিকার কাজ সম্পন্ন হয় নি সেসব প্রজাতিরও রেড লিস্ট অবস্থান নির্ধারণ এবং সংরক্ষণ কার্যক্রম নিশ্চিত করতে ভবিষ্যতে এই প্রজাতিগুলোর মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
এছাড়াও প্রতিবেদনে আরো বরা হয়েছে, এই প্রকল্পের দ্বিতীয় উপাদানের লক্ষ্য ছিল পাঁচটি নির্বাচিত সংরক্ষিত বনাঞ্চলে (যেমন, হিমছড়ি, কাপ্তাই ও মধুপুর জাতীয় উদ্যান, রেমা কালেঙ্গা এবং সুন্দরবন পূর্ব বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য) স্থানীয় বনজীববৈচিত্রের উপর আগ্রাসী উদ্ভিদ প্রজাতির (IAS) প্রভাব হ্রাসের একটি জাতীয় ব্যবস্থাপনা কৌশল প্রণয়ন করা এবং এগুলো নিয়ন্ত্রণে ব্যয় সাশ্রয়ী ব্যবস্থা গড়ে তোলা। বর্তমানে বাংলাদেশের বনভূমির পরিমাণ বৃদ্ধি করার জন্য আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরো বেশি প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। আমরা ইতিমধ্যে ৫৩ টিরও বেশি জাতীয় উদ্যান এবং অভয়ারণ্য ঘোষণা করেছি যা বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বন সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বাণিজ্যিক ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে বিভিন্ন সময়ে বৃক্ষ রোপন করা হচ্ছে, তবে প্রায়ই রোপিত গাছ গুলোর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিদেশি আক্রমাত্মক প্রজাতি। বাংলাদেশে কচুরিপানা, আসাম লতা, ল্যান্টানা প্রভৃতি আক্রমণাত্মক প্রজাতির দ্রুত বিস্তারের একটি উদ্বেগজনক চিত্র দেখা গেছে। কর্মসূচির বাস্তবায়ন ফলে আমরা ১৭ টি ক্ষতিকারক আক্রমণাত্মক উদ্ভিদ প্রজাতি সনাক্ত করেছি যার মধ্যে সাভটি প্রধান, যেমন Chromolaena odorata আসাম গাছ), Mikania seandens (আসাম লভা, (রফুজি লতা), Mimosa pudica (লজ্জাবতী). Imperata cylindrica (জন), Saccharum spontaneum (কাশ), Eichhornia crassipes (কচুরিপানা) এবং Lantana camara (মগকাটা, ল্যান্টানা)। এই প্রজাতি গুলো স্থানীয় প্রজাতির সাথে প্রতিযোগিতায় সক্ষম, বাস্তুতন্ত্রের প্রক্রিয়া ব্যাহত করতে পারে এবং খাদ্যজালের ভারসাম্য নষ্ট করে। এছাড়া এই আক্রমাত্মক প্রজাতির প্রভাব সাধারণত অপরিবর্তনীয় এবং এগুলোর সামাজিক, পরিবেশগত এবং প্রকৃতিগত প্রভাব বিস্তৃত এবং নেতিবাচক বলে উল্লেখ করা হয়েছে।