এস এম মোজাম্মেল হক
যে কোনো ব্যাবসায়িক বা শিল্প প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণের জন্য পুঁজি একটি অন্যতম শর্ত। তবে সব ব্যাবসা বা শিল্প স্থাপনের জন্য অধিক পুঁজির প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন হয় সঠিক পরিকল্পনার। যা স্বল্প পুঁজিতেও বাস্তবায়ন করা সম্ভব ।গ্রামে নির্দিষ্ট ঠিকানায় যুগ যুগ ধরে বংশ পরম্পরায় বসবাস করা লোকজন পরস্পরের পরিচিতি ও অতি নিবিড় সম্পর্কযুক্ত। গ্রাম যেহেতু সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা বিস্তীর্ণ মাঠ ঘাট সমৃদ্ধ তাই সেখানে সহজে উৎপাদন যোগ্য ফসল ও বন বনানীর চাষ খুবই সহজসাধ্য। গ্রামের লোকজন যেহেতু দীর্ঘদিন পরস্পরের সান্নিধ্যে থেকে একে অপরের ঘনিষ্টতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার ক্ষেত্রে পূর্বথেকে ওয়াকিবহাল তাই তাদের মধ্যে সমবায় ভিক্তিক কাজ ও আর্থিক লেনদেন খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার যার ফলে তারা সহজেই পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে নিজেদের উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন।
গ্রামের লোকদের চেনাজানা থাকে আশপাশের কয়েক গ্রামের লোকদের সাথে যা শহরের চেয়ে গ্রামের লোকজনের জন্য একটি বাড়তি সুবিধা। এস এস সি, এইচ এস সি পাশ করে উঠতি বয়সের যারা কর্মমুখী বেকার তাদের জন্য বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রায়ই শোনা যায় জমি জিরাত বিক্রি করে বা বন্ধক রেখে উপরন্তু আত্মীয় স্বজনের নিকট থেকে ধার কর্জ করে কয়েক লক্ষ টাকা খরচ করে বিদেশ গিয়ে যা রোজগার করে তাতে ভিসার মেয়াদে সংসার খরচ বহন করে দায় দেনাও শোধ করা সম্ভব হয় না।যা ভূক্তভোগীদের জন্য খুবই কষ্টের অথচ যে অর্থ ব্যয় করে বিদেশ গমন করে সে অর্থ দ্বারা দেশে কোনো ব্যবসা বাণিজ্য করলে অনেক ভালো থাকা সম্ভব। এ জন্য প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা।
পৃথিবীর ঘণবসতিপূর্ণ দেশ সমূহের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। উপরন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে বাড়তি ঘরবাড়ির প্রয়োজনে ফসলী জমি ইতোমধ্যে অনেক হ্রাস পেয়েছে। ফলে ফসলী জমি নষ্ট করে অন্য কাজে ব্যবহারের সুযোগ খুবই কম তাই বিকল্প পন্থায় নানামুখী উৎপাদন বাড়ানোর দিকে নজর দেয়া খুবই দরকার। এ জন্য পরিকল্পিত উপায়ে প্রাপ্ত সুবিধা কাজে লাগিয়ে বেকারত্ব হ্রাস ও অল্পপুঁজীতে উদ্যোক্তা হয়ে সফলতা লাভের যে সহজ উপায় রয়েছে সে বিষয়ে আলোকপাত করার চেষ্টা। এর ফলে কিছু লোকের জীবনেও ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটলে চেষ্টা স্বার্থক হয়েছে বলে বিবেচিত হবে।
গ্রামে যাদের জন্ম তাদের স্কুল কলেজে পড়া লেখা সময় প্রায় সকলেরই গ্রামে অবস্থানের অভিজ্ঞতা রয়েছে। গ্রামে জন্ম এবং বেড়ে উঠার কারণে আমিও তার ব্যতিক্রম নই। উপরন্তু প্রায় তিন যুগ চাকুরীর সুবাদে পৌর শহর ও গ্রামে বসবাসকারী প্রায় সব ধরনের লোকজনের জীবন যাত্রা খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। নিজেও প্রকৌশল পেশায় দায়িত্ব পালনের সুবাদে গ্রামীণ অবকাঠামো এবং আর্থ সামাজিক উন্নয়নের সাথে সরাসরি যুক্ত থাকায় লব্ধ অভিজ্ঞতার আলোকে আত্মকর্ম সংস্থানের ব্যাপারে ইতিপূর্বেও অনেক নিবন্ধে দিকনির্দেশনা রয়েছে। বর্তমান পরিবর্তীত প্রেক্ষাপটে ভিন্ন কিছু উপস্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। নিবন্ধে বর্ণিত তথ্যানুযায়ী কর্মপন্থা গৃহীত হলে উপকৃত হবার যথেষ্ট সুযোগ আছে।
গ্রামের মানুষের মধ্যে চেনা -জানা ও সৌহার্দ বেশী থাকায় সমবায় ভিত্তিতে কাজ করা অনেক সহজ ও বিশ্বাসযোগ্য। সব বয়সের লোকের সম্পৃক্ত হবারও রয়েছে অতিরিক্ত সুযোগ। যার ফলে অভিজ্ঞদের নিকট থেকে খুব সহজেই অন্যরা সময় ও খরচ বাচিয়ে প্রশিক্ষিত হবার সুযোগ লাভে সমর্থ হবে। প্রতি গ্রামেই কাঁচা পাকা অনেক সড়ক রয়েছে যার বেশীর ভাগের মালিকানাই এলজিইডি ও জেলা পরিষদের। এসব সড়কের উপরিভাগের উন্নয়ন ব্যতিত সড়কের দুই ধারে প্রচুর পতিত জায়গা তেমন কোনো কাজেই লাগে না।
বেশ কয়েক বছর যাবত মৌজা নির্ধারণী সীমানা পিলার চুরি ও উঁচু বৃক্ষ নিধনের ফলে বজ্রপাতে আশংকাজনকভাবে মৃত্যু ঝুঁকি বেড়ে গেছে এবং চিল, বাজ ও শকুন জাতীয় পাখি যারা উঁচু ও নিরাপদ বৃক্ষে বাসা বেধে বংশ বিস্তার করে নিরাপত্তার অভাবে স্থান পরিবর্তনের ফলে দিন দিন এদের সংখ্যা কমে বিরল প্রজাতিতে পরিনত হচ্ছে যা নিরসনকল্পে ধ্রুত বর্ধনশীল ও বেশী লম্বা জাতের বৃক্ষ রোপনের উপর জাতীয়ভাবে জোড় দেয়া হয় যার ফলশ্রুতিতে এলজিইডির নিজস্ব অর্থায়নে সড়কের দুই ধারে তাল গাছ লাগানোর কর্মসূচী হাতে নেয়া হয়।
এ ছাড়াও এলজিইডি কর্তৃক তেভাগা চুক্তিতে ঐ সব পতিত জায়গায় এলাকার সাধারণ লোকজন কর্তৃক গঠিত দলীয় ভিত্তিতে বৃক্ষরোপনের সুযোগ রয়েছে। যা শুধু কর্মক্ষম নয় স্কুল কলেজ পড়ুয়াদের মাধ্যমেও হতে পারে। এতে যেমন তাদের অলস সময় কাজে লাগিয়ে ছাত্রাবস্থায় রোজগার ও অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হবে যার মাধ্যমে পরিবারে অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ আসবে ও কর্মজীবনে বাড়তি অভিজ্ঞতা হিসেবে কাজে আসবে। বিষয়টি শুধু নীতি নির্ধারণী পর্যায় সীমিত না রেখে প্রচার মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার করে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করা যেতে পারে।
গ্রামে কাজের ক্ষতি না করে সকাল সন্ধার অবসর সময়ে খেজুর ও তালের রস সংগ্রহ সংসারে বাড়তি আয়ের একটি অপূর্ব সুযোগ। এ কাজ শেখার জন্য খুব বেশী প্রশিক্ষণ এর প্রয়োজন নেই। যে কোনো বয়সের লোকজনই এ কাজের যোগ্য।ইট ভাটায় জালানী হিসেবে খেজুর গাছের ব্যাপক কর্তনের ফলে খেজুর গাছের সংকট হলে খুব অল্প সময়েই খেজুর গাছ উৎপাদন সম্ভব। যাতে তেমন খরচ বা ফসলি জমি নষ্ট হয় না। তাল ও খেজুর গাছ বাড়ীর আনাচে কানাচে ও রাস্তার ঢালে বিনা যত্নে বেড়ে উঠে।
খেজুর রস ও তালের এখন যা মূল্য তাতে এ কাজকে অবজ্ঞা করার কোনো সুযোগ নেই। খেজুর বাগানের খালি জায়গায় আদা হলুদের চাষ করে যেমন বাড়তি আয় সম্ভব তেমনি রাস্তার ঢালে প্রায় সারা বছর কয়েক বার মাস কালাই চাষ সম্ভব যাতে চাষ ও পোকা দমনের জন্য ঔষধ বাবদ বাড়তি খরচের প্রয়োজন হয়না। মাস কালাই খাদ্য ও পশু খাদ্য হিসেবে খুবই উন্নত ও সাশ্রয়ী। মাস কালাই এর আমির্তি স্বাদে অতুলনীয়। গ্রামে যে সকল লোক কাজের অভাবে বেকার জীবন কাটায় তাদের জন্য এ রকম বহু কাজ আছে যা একটু চোখ কান খোলা রাখলেই খুঁজে পাওয়া সম্ভব।
প্রধান উপদেষ্টা ঘোষিত (০০০) থ্রি জিরো গ্রামীণ জনপদে এভাবেই উদ্যোক্তা তৈরী করতে পারে। এ জন্য প্রয়োজন সচেতনতা ও পরনির্ভরশীল না হয়ে আত্মনির্ভরশীলতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হওয়া। যুব সমাজের মধ্যে এ চেতনা জাগ্রত হলেই বেকারত্ব নিরসন হয়ে দেশ আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠবে।যুব সমাজের কাছে দেশবাসীর এটাই প্রত্যাশা।
লেখক-কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট ও গবেষক।
সেন্ট এলবান্স, নিউইয়র্ক, আমেরিকা।