কৃষি সংবাদ প্রতিবেদক:
স্মার্ট বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আগামী ১২ জানুয়ারি থেকে ঢাকা শহরের ২০টি পয়েন্টে সীমিত লাভে ডিম, ফ্রোজেন মুরগি এবং অন্যান্য কৃষিজাত পণ্য বিক্রি করবে বাংলাদেশ পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএ)। পরবর্তী সময়ে পর্যায় ক্রমে ঢাকার ১০০ পয়েন্টে এ কার্যক্রম সম্প্রসারণ করবে তারা।
আজ শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ‘পোল্ট্রি শিল্পের সমস্যা সংকট ও সমাধানের জন্য পোল্ট্রি বোর্ড গঠন করে, বিপিএ- এর ১০ দফা দাবি বাস্তবায়ন’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান প্রান্তিক খামারিদের সংগঠন বিপিএ’র সভাপতি সুমন হাওলাদার।
তিনি বলেন, আসন্ন রমজান মাস উপলক্ষে ডিম এবং মুরগির বাজারে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে এবং বাজারে সঠিক দাম নিশ্চিত করার উদ্দেশে বিপিএ এই উদ্যোগ নিয়েছে। বিপিএ’র এই সাপ্লাই চেইনে যুক্ত থাকবে দক্ষ ব্যক্তি ও উদ্যোক্তা। এর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছুসংখ্যক স্মার্ট শিক্ষার্থী এবং কৃষিখাত এবং ভোক্তা-উৎপাদকের স্বার্থ নিয়ে কাজ করতে আগ্রহীরাও যুক্ত থাকবে । তাদের দক্ষতা এবং উদ্যমের মাধ্যমে এই উদ্যোগটি আরও কার্যকরী হবে, যা দেশের কৃষি খাতের উন্নতি এবং বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করবে।
সুমন হাওলাদার আরো বলেন, বর্তমানে প্রান্তিক খামারিরা ডিম ও মুরগির ৮০ শতাংশ উৎপাদন নিশ্চিত করে। আর সেখানে করপোরেট গ্রুপের উৎপাদন করে মাত্র ২০ শতাংশ।
তিনি বলেন, কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর ফিড ও মুরগির বাচ্চার সিন্ডিকেটের কারণে ডিম এবং মুরগির বাজারে মাঝে মাঝে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্পে কর্পোরেট গ্রুপ ও প্রান্তিক খামারিদের মধ্যে উৎপাদন খরচের বড় ধরনের বৈষম্য একটি অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ।
কর্পোরেট গ্রুপগুলো ‘কৌশলে বাজার দখল করে’ দাবি করে তিনি বলেন, প্রতিটি ডিম উৎপাদনে প্রান্তিক খামারিদের খরচ হয় গড়ে ১০ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ১১ টাকা; প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগির ক্ষেত্রে ১৫৫ টাকা থেকে ১৭০ টাকা; সোনালি মুরগির ক্ষেত্রে ২৪০ টাকা থেকে ২৬০ টাকা। আর কর্পোরেট কোম্পানির উৎপাদন খরচ প্রতি ডিমে ৮-৯ টাকা; ব্রয়লার মুরগিতে ১৩০-১৪০ টাকা; সোনালি মুরগিতে ২০০-২২০ টাকা। এই বৈষম্যের কারণে কর্পোরেট গ্রুপগুলো কৌশলগতভাবে দাম কমিয়ে বাজার দখল করে প্রান্তিক খামারিদের দুর্বল করে দিচ্ছে।
এই সংকট কাটাতে সরকার ঘোষিত ডিম ও মুরগির ‘যৌক্তিক দাম’ বাস্তবায়ন করা জরুরি বলে মন্তব্য করেন সুমন হাওলাদার।
তিনি বলেন, প্রান্তিক খামারিরা উচ্চ উৎপাদন খরচের কারণে লাভ করতে পারে না, ফলে তাদের অনেকেই ব্যবসা বন্ধ করে দিচ্ছে। সরকার ঘোষিত ডিম ও মুরগির উৎপাদক পর্যায়ের দাম যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে ভোক্তা পর্যায়ে ডিম মুরগির দাম অনেক কমে যাবে। প্রান্তিক খামারিরা দেশের পোল্ট্রি শিল্পের মেরুদণ্ড। যদি তাদের সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে কর্পোরেট গ্রুপ বাজারে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে।
ডিম বা মুরগির দাম বাড়লে সারা দেশে আলোচনা হয়, সরকারও দ্রুত হস্তক্ষেপ করে; কিন্তু ফিড বা মুরগির বাচ্চার দাম বাড়লে সরকারকে উদ্যোগী হতে দেখা যায় না বলে অভিযোগ করেন সুমন হাওলাদার।
তিনি বলেন, ফিড ও বাচ্চার দাম বাড়লে এর সরাসরি প্রভাব প্রান্তিক খামারির উপর পড়ে। তারা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পান না। তাদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।
ফলে, যখন খামারিদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যায় এবং তারা এই খরচ তুলতে না পারলে, বাজারে আস্থাহীনতা এবং অস্থিরতা তৈরি হয়। এর ফলে, একদিকে যেমন পোল্ট্রি শিল্পের সংকট সৃষ্টি হয়, অন্যদিকে ছোট খামারিরা ব্যবসা থেকে সরে যায় এবং কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর আধিপত্য আরও বাড়ে।
কর্পোরেট কোম্পানি আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে ফিডের দাম বৃদ্ধি করেছে দাবি করে সুমন হাওলাদার বলেন, এখন আন্তর্জাতিক বাজারে ফিডের দাম কমে এলেও দেশের বাজারে তার কোনো প্রতিফলন ঘটেনি। যখন মুরগির বাচ্চা আমদানি করা হত, তখন দেশের বাজারে মুরগির বাচ্চার দাম ছিল কম, কিন্তু দেশের উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ার পরেই কোম্পানিগুলো সিন্ডিকেট গঠন করে এবং দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এই সিন্ডিকেটের কারণে দেশের প্রান্তিক খামারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, এবং একচেটিয়া কর্পোরেট গ্রুপগুলোর হাতে পুরো পোল্ট্রি বাজার চলে যাচ্ছে।
কর্পোরেট কোম্পানিগুলো ফিড ও মুরগির বাচ্চা থেকে ‘বছরে ৬ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত মুনাফা করছে’ বলে অভিযোগ করেন পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি।
তিনি বলেন, এর পরেও কোম্পানিগুলো সরকারকে তাদের মনগড়া ক্ষতির গল্প শোনাচ্ছে। এই ধরনের অবস্থা শিল্পকে আরো বিভ্রান্তিকর এবং শঙ্কিত করে তুলবে। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হচ্ছে, যা দেশের খামারীদের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
এই সংকট কাটাতে পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে ১০ দফা দাবি তুলে ধরা হয়।
কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর কাজ ফিড ও বাচ্চা উৎপাদন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রাখা; তাদের ‘সিন্ডিকেট’ ভেঙে খামারিদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে ফিড ও বাচ্চা সরবরাহ নিশ্চিত করা; খামারিদের উৎপাদন বাড়াতে সহায়তা করতে ঋণ ও ভর্তুকি দেওয়ার পাশাপাশি প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া; প্রান্তিক খামারিদের উৎপাদিত পণ্য সরাসরি বাজারে সরবরাহ করার ব্যবস্থা করা, পোলট্রি খাতের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি; কন্ট্রাক্ট ফার্মিং বন্ধ করার মত দাবি রয়েছে সেখানে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, আগামী রোজার মাসে ডিম মুরগির বাজারে স্বস্তি রাখতে বিপিএ এর সার্বিক সহযোগিতায় ঢাকায় ১০০ পয়েন্টে ‘সীমিত লাভে’ ডিম মুরগি ও কৃষিজাত পণ্য বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ কার্যক্রমে সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন সংগঠনের সভাপতি।
সুমন হাওলাদারের সভাপতিত্বে বিপিএ এর সহ সভাপতি বাপ্পি কুমার দে, সাধারণ সম্পাদক মো. ইলিয়াস খন্দকার, যুগ্মসাধারণ সম্পাদক মো. কাউছার আহমেদ, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. ইকবাল হোসেন, দপ্তর সম্পাদক মো. মেজবাউল হক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যসহ জেলা উপজেলা পর্যায়ের ডিম ও মুরগি উৎপাদনকারী প্রান্তিক খামারিরা উপস্থিত ছিলেন।