সুমন ইসলাম :
সাদা সোনা খ্যাত চিংড়ির মানসম্পন্ন উৎপাদন, চাষ সম্প্রসারণ, বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়নসহ আর্থিক প্রণোদনার মাধ্যমে ক্লাস্টার চিংড়ি ফার্মিংয়ে জোড় দিচ্ছে সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় দেশের বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা, যশোর এবং গোপালগঞ্জ জেলার ৭৫০০জন চিংড়ি চাষিকে নিয়ে ৩০০টি ক্লাস্টার করা হয়েছে। এর মধ্যে খুলনায় ৯৪টি, বাগেরহাটে ৯৬টি, সাতক্ষীরায় ৭৪টি, গোপালগঞ্জে ২৪ টি এবং যশোরে ১২ টি ক্লাস্টার করা হয়েছে বলে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানাগেছে।
সূত্র জানায়, এক্সপোর্ট অরিয়েন্টেড এই চিংড়ি চাষকে একটি ছাতার তলে এনে চিংড়ি অধ্যুষিত এলাকার চিংড়ি চাষিদের নিয়ে গ্রুপ ভিত্তিক চাষ করানো হচ্ছে। ঘের সংশ্লিষ্ট এলাকার উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তারা চাষিদের নিয়ে মাঠে কাজ করছেন চিংড়ির উৎপাদন বৃদ্ধিতে। এছাড়াও সমমনা এবং আগ্রহীদের সবাইকে একই ধরণের বা মানের উৎপাদন, কৌশল, পানি, পোনা, টেকনিক্যাল সাপোর্ট দিয়ে চিংড়ি উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে। এ জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করা হয়েছে। চালু করা হচ্ছে ই-ট্রেসেবিলিটি সিস্টেমস। ফলে যে কেউ চাইলেই বারকোড স্ক্যান করেই জানতে পারবেন কোথায় উৎপাদন হয়েছে, এতে কি কি ব্যবহার করা হয়েছে। ঘের প্রস্তুত থেকে শুরু করে সব কিছু তথ্য সন্নিবেশন করা হচ্ছে। পাশাপাশি চাষিদের জবাবদিহীতার মধ্যে নিয়ে আসা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ৩০০ ক্লাস্টারকে প্রায় ৩৪ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। পোনা উৎপাদনসহ হ্যাচারি, নার্সারি এবং ব্রুড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে ২৩টি প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করা হয়েছে।
এ বিষয়ে সাসটেইনেবল কোস্টাল এন্ড মেরিন ফিশারিজ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক জিয়া হায়দার চৌধুরী বলেন, দেশের চিংড়ি শিল্পের উন্নয়নের জন্য আমরা কাজ করছি। দেশের ৬ হাজার ১৩৩ হেক্টর আয়তনের ৭ হাজার ৫১৩টি ঘের নিয়ে আমরা ক্লাস্টার ফার্মিং শুরু করেছি। এ কাজে ৭ হাজার ৫শ জন চাষি রয়েছেন এদের মধ্যে ১ হাজার ৭২০জন নারীও রয়েছেন। আমরা আমাদের বেইজ লাইন উৎপাদনে দেখেছি, দেশের ১১৮টি ঘেরে গলদা মিশ্র চাষে হেক্টর প্রতি উৎপাদন হয়েছে ৫৫৮ কেজি, গলদা বাগদা মিশ্রচাষে ১২৪ টি ঘেরে আমরা উৎপাদন পেয়েছি ৭০১ কেজি, শুধুমাত্র বাগদা চাষের জন্য ৫৮ টি ঘেরে আমরা উৎপাদন পেয়েছি হেক্টর প্রতি ৩৪৫ কেজি। তিনি আরো বলেন, আমাদের ক্লাস্টার ফার্মিংয়ে চিংড়ি উৎপাদনের যে ধারা চলছে, সেটি সারা দেশে প্রচলন করা সম্ভব হলে দেশের ২ লাখ ৬৩ হাজার ২৬ হেক্টর আয়তনের ঘেরে উৎপাদন বাড়বে ১ লাখ ৬৩ হাজার ৪৯১ মে.টন, রফতানিও প্রায় ৩৫ শতাংশ বা ৮৭ হাজার ৬১৫ মে. টন। যার মাধ্যমে আয় হবে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। রফতানি আয় বৃদ্ধি পাবে ৭ হাজার কোটি টাকার ওপরে।
বাংলাদেশে ক্লাস্টার ফার্মিং সম্পর্কে প্রকল্পের সাসটেইনেবল কোস্টাল এন্ড মেরিন ফিশারিজ প্রকল্পের উপ প্রকল্প পরিচালক মনিষ কুমার মন্ডল জানান, আমাদের দেশে ক্লাস্টার পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষের ইতিহাস প্রায় এক দশকের ও অধিক সময় ধরে। মৎস্য অধিদপ্তরের ইনোভেশন উদ্যোগের আওতায় ২০১৩ সালে খুলনা জেলার ডুমরিয়া উপজেলায় মাত্র ৫ জন চাষি নিয়ে একটি ক্ষুদ্র ক্লাস্টার গঠন করে চিংড়ি উৎপাদন বৃদ্ধির চেষ্টা করা হয়। পরবর্তীতে ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে মৎস্য অধিদপ্তরের এসটিডিএফ (এফএও এর কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় এবং ওয়ার্ল্ড ফিস ও বাংলাদেশ শ্রিম্প ও ফিস ফাউন্ডেশনের সহায়তায়) প্রকল্পের মাধ্যমে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলায় ৫টি উপজেলায় ৪০টি চিংড়ি ক্লাস্টার গঠন করে পাইলটিং কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়। ক্লাস্টার পদ্ধতিতে চিংড়ি চাষের ধারাবাহিত সফলতা অর্জিত হয়েছে খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার বড়ডাঙ্গা গ্রামে। যা চিংড়ি চাষের বড়ডাঙ্গা মডেল নামে ব্যপক পরিচিতি লাভ করেছে। ২০১৩ সাল হতে ঐ গ্রামের চাষিরা ক্লাস্টারের ম্যাধমে চিংড়ি চাষ করে আসছেন। চাষের শুরুতে তাদের হেক্টর প্রতি গড় উৎপাদন ছিল গলদা চিংড়ি, বাগদা চিংড়ি ও কার্প জাতীয় মাছ যথাক্রমে ৪৬০ কেজি, ২৫০কেজি এবং ৫৭০ কেজি যা বর্তমানে বেড়ে দাড়িয়েছে গলদা চিংড়ি, বাগদা চিংড়ি ও কার্প জাতীয় মাছ যথাক্রমে ৯৮০ কেজি, ৫৩২ কেজি এবং ৮৭৬ কেজি। এই উৎপাদন বেইজলাইন উৎপাদনের দ্বিগুনেরও বেশী। শুধু উৎপাদন বৃদ্ধি নয় বিগত ১০ বছর ধরে ঐ ক্লাস্টারগুলোতে কোন ধরণের রোগ বালাইয়ের সংক্রমণ ঘটেনি। চাষির উৎপাদন বেড়েছে, আয় বেড়েছে এবং চিংড়ি চাষের প্রতি আত্মবিশ্বাস ও আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, গত ২২-২৩ সময়ে আমরা ৯০ ক্লাস্টারে উৎপাদন তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছি, বাগদা চিংড়ির ক্ষেত্রে হেক্টর প্রতি বেইজলাইন উৎপাদন ৩৬৮ কেজির বিপরীতে ৭২১ কেজি হয়েছে এবং গলদার ক্ষেত্রে হেক্টর প্রতি ৬১৭ কেজির বিপরীতে ১০৯২ কেজি উৎপাদন হয়েছে।
উপ প্রকল্প পরিচালক আরো বলেন, মৎস্য অধিদপ্তরের সাসটেইনেবল কোস্টাল এন্ড মেরিন ফিশারিজ প্রজেক্টের আওতায় গঠিত ক্লাস্টারগুলোতেও একই ধরণের সফলতা পাওয়া গেছে। বিগত ২০২০-২১ অর্থ বছর হতে প্রকল্পের মাধ্যমে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, যশোর ও গোপালগঞ্জ জেলার ২৮টি উপজেলার ৭৫০০ জন চাষি ক্লাস্টার ভুক্ত। ক্লাস্টারে অন্তর্ভুক্ত ঘেরগুলোর প্রয়োজনীয় মাটি কেটে ঘেরের পানির গভীরতা বৃদ্ধিসহ অবকাঠামো উন্নয়ন করা হয়েছে। এছাড়া চাষের ক্ষেত্রে উন্নত সনাতন পদ্ধতি অনুসরণ করা, জৈব নিরাপত্তা ব্যবস্থা বজায় রাখা, এসপিএফ (স্পেসিফিক প্যাথোজেন ফ্রি) বাগদা পিএল মজুদ করা, ক্লাস্টারের সকল চাষি একই চাষ পদ্ধতি অনুসরণ করা, চাষের ক্ষেত্রে গুড এ্যাকুয়াকালচার প্রাকটিস অনুসরণ করা ইত্যাদি বিষয়গুলো কঠোরভাবে প্রতিপালন করা হচ্ছে। ফলে চাষির উৎপাদন কাঙ্খিত মাত্রার চেয়েও বেশী বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাগেরহাট চিংড়ি গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. হারুনর রশিদ বলেন, আগের থেকে চিংড়ি গবেষণায় আমরা অনেক অগ্রসর হয়েছি। আমাদের আগে কিছু চিংড়ির পোনা উৎপাদনে সমস্যা ছিল বিশেষ করে গলদা। আমারা গবেষণার মাধ্যেমে সেই সব সমস্যার সমাধান করেছি। আশা করি, আমরা পোনার চাহিদা পূরণ করতে পারবো। ব্রুড ব্যবস্থাপনার জোরদার করার মাধ্যমে আমাদের প্রযুক্তি ব্যবহার করে এখন যে কেউ চাইলেই গলদা চিংড়ির পোনা উৎপাদন করতে পারবে। দেশের যেখানে ২শ কোটি গলদা পোনার প্রয়োজন সেখানে আমরা আগে যোগান দিতে পেরেছি মাত্র ৪-৫ কোটি।
তিনি আরো বলেন, সরকার একার পক্ষে চিংড়ির উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব নয়। সারা দেশে যেসব ঘের রয়েছে তার গভিরতা ঠিক রেখে চিংড়ি চাষ সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকেও ক্লাস্টার পদ্ধিতিতে কন্টাক্ট ফার্মিংয়ে এগিয়ে আসতে হবে। তাহলে আমাদের চিংড়ির উৎপাদনের সঙ্গে সঙ্গে রফতানি আয়ও বৃদ্ধি পাবে।