সুমন ইসলাম:
আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম কমলেও দেশের বাজারে ঊর্ধ্বগতি কিছুতেই লাগাম টানা যাচ্ছে না। সরকারের দাম নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর নিরবতা এবং করপোরেট সিন্ডিকেটের প্রভাব প্রতিপত্তির কারণে দেশে উৎপাদন ও মজুতে রেকর্ড সর্বোচ্চ হলেও দমি নিংন্ত্রণ করা যাচ্চে না। বাজার স্থিতিশীল রাখতে বেসরকারিভাবে চাল আমদানির অনুমোদন, নিম্নআয়ের মানুষের জন্য ওএমএস এবং খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি গ্রহণসহ সরকারের নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও বাজারে এর কোনো প্রভাব পড়ছে না। তবে এটিকে অস্বাভাবিক বলছেন বাজারবিশ্লেষক ও ক্রেতা-বিক্রেতারা। দেশে বোরো মৌসুমে ভালো ফলন হয়েছে। সরকারি গুদামে খাদ্য মজুদ পরিস্থিতিও সন্তোষজনক। তারপরও গত তিন মাস বাজারে চালের দাম ঊর্ধ্বমুখী। এ অবস্থায় বিদেশ থেকে জরুরি ভিত্তিতে চাল আমদানি করতে ক্রয় প্রক্রিয়ার সময় কমিয়ে আনা হয়েছে। দেশে এবার বোরো মৌসুমে ভালো ফলন হয়েছে। সরকারি গুদামে খাদ্য মজুদ পরিস্থিতিও সন্তোষজনক।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী , দেশের মোট ধানের প্রায় ৫৫ শতাংশ বোরো মৌসুমে উৎপাদন হয়। এবারের বোরো মৌসুমে ২ কোটি ২৬ লাখ টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ২ কোটি ১৪ লাখ টন ধান উৎপাদন হয়েছে। এদিকে বর্তমানে সরকারের কাছেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে খাদ্যশস্যের মজুদ রয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুসারে, ১২ আগস্ট পর্যন্ত সরকারি মজুদের পরিমাণ ছিল ২০ লাখ ৬০ হাজার ১৮৭ টন। এর মধ্যে ১৯ লাখ ৮৭ হাজার ৬৬৬ টন চাল ও ৮২ হাজার ৪৬৯ টন ধান মজুদ রয়েছে। অপরদিকে ১২ আসস্ট পর্যন্ত বোরো সংগ্রহ করা হয়েছে ১৬ লাখ ২৮ হাজার ৩০৫ মে.টন। এর মধ্যে ধান ৩ লাখ, ৭৬ হাজার ৯৪২ টন, সিদ্ধ চাল ১৩ লাখ ৩৬ হাজার ৩৬৯ টন এবং আতপ চাল সংগ্রহ করা হয়েরছে, ৪৬ হাজার ৯২৪ টন। বোরো সংগ্রহ এবং সরকারি গুদামে মজুদ রয়েছে ৩৬ লাখ ৮৮ হাজার ৪৪৫ টন চাল। এর সঙ্গে সরকারিভাবে আমদানি করা চালের ৫০ হাজার মে. টন যুক্ত করা হলে ৩৬ লাখ ৮৮ হাজার ৪৯৫ টন চাল রয়েছে সরকারের হাতে এ চাল দিয়ে সরকার আগামী দুমাস খাওয়াতে পারবে দেশের মানুষকে।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিস্টিটিউটের (ব্রি) পলিসি গবেষণার প্রজেকশন অনুযায়ী, ২০৩০ সালে বাংলাদেশে ৪ কোটি ৬৯ লাখ টন, ২০৪১ সালে ৫ কোটি ৪১ লাখ টন এবং ২০৫০ সালে ৬ কোটি ৯ লাখ টন চালের প্রয়োজন হবে।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে মাথাপিছু দৈনিক চাল গ্রহণের পরিমাণ ৩২৮ দশমিক ৯ গ্রাম হয়েছে। শহরাঞ্চলে মাথাপিছু চাল গ্রহণের পরিমাণ কিছুটা কম। এ হিসাবে জন প্রতি মাসে প্রায় ১০ কোজি চালের প্রয়োজন। ১৭ কোটির মানুষের প্রতিদিনের হিসাব ধরে মাসে প্রযোজন ১৭ লাখ মে. টন আর বছরে প্রয়োজন হয় প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ টন চাল। শুধু ভাত হিসেবে এ চাল মানুষ গ্রহণ করে। এর বাইরে বিভিন্ন পোলট্রি ফিড, বীজসহ অন্যান্য প্রয়োজনে চাল ব্যবহার হয় ১ কোটি টন। সবমিলে প্রয়োজন ৩ কোটি ৬০ লাখ টন। কিন্তু গত বছরে উৎপাদন হয়েছে ৪ কোটি ১৩ লাখ টন।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, চালের দাম এখন এক বছর আগের তুলনায় ১৫-২০ শতাংশ বেশি। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব বলছে, এ বছরের বোরো মৌসুমে চালের উৎপাদন হয়েছে ২ কোটি ২৬ লাখ টন, আর আমন মৌসুমে হয়েছে ১ কোটি ৬৫ লাখ টন। এমনকি আগের বছরের আমন ও বোরোর মোট উৎপাদনের চেয়ে এবার প্রায় ১৩ লাখ টন বেশি চাল উৎপাদন হয়েছে। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে চাল আমদানি করা হয় ১৪ লাখ ৩৬ হাজার টন যা গত সাত বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার বলেন, প্রতি মাসে পাবলিক ফুড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেমে তিন লাখ টনের বেশি চালের প্রয়োজন হয়। আমাদের জরুরি মজুদ রাখতে হয় সাড়ে ১৩ লাখ টন। কোনো কারণে সামনে যদি আমন ফসলের উৎপাদন কম হয়, তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে সেটি পূরণ করা সম্ভব হবে না। এ কারণে জরুরি মজুদ ঠিক রাখার জন্য চাল আমদানি করা হচ্ছে।
রাজধানীর কারওয়ান বাজারের চাল ব্যবসায়ী মো. ওয়ালিউল্লাহ বলেন, কোরবানির ঈদের পর থেকে চালের দাম বেড়েছে। মিনিকেট জাতীয় মাঝারি চালের দাম ১২-১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। বর্তমানে এ চালের দাম সবচেয়ে বেশি। এখন ৭৮ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত সরকারের আমলে যেভাবে সিন্ডিকেট করে চাল মজুদ করে সংকট তৈরি করা হতো, এখনো সেটার পরিবর্তন হয়নি। আওয়ামী লীগের আমলে ধাপে ধাপে দাম বাড়ানো হতো। কিন্তু এবার দেখা গেল কয়েকদিনে দাম নাগালের বাইরে চলে গেল।
বাসাবো বাজারের খুচরা চাল ব্যবসায়ী হাবিব মুন্সি বলেন, আমাদের বাজারটা নির্ভর করে পাইকারদের ওপর। তারা কেজিপ্রতি ৫০ পয়সা বেশি নিলে সেটা কেজি হিসেবে প্রভাব পড়ে। এখন মিনিকেট চাল সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে, কিন্তু সেটার দাম বেড়েছে ১০ টাকার ওপরে। এখন সর্বোচ্চ ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আগে ৫ টাকা বাড়লে সরকার ২ টাকা কমিয়ে আনতে পারত। এখন সেটাও হচ্ছে না। বোরো মৌসুমে বন্যা, দুর্যোগে ক্ষয়ক্ষতি হয়নি, ফসলও ভালো হয়েছে তার পরও দাম বাড়ছে। সরকার এ জায়গায় নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না।
ট্রেডিং ইকোনমিকস বলছে, বিশ্ববাজারে চালের দাম এক মাসে কমেছে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। চলতি বছরের সাত মাসে কমেছে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। আর এক বছরে একই সময়ের তুলনায় কমেছে ১৪ দশমিক ১৬ শতাংশ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ীও চলতি বছরে সব ধরনের চালের মূল্যসূচক ১৩ শতাংশ কমেছে।
রাষ্ট্রীয় বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)-বাজার দরের তথ্য অনুযায়ী গত একমাসে নতুন করে চালের দাম না বাড়লেও গত বছরের একই সময়ের তুলনায় সরুজাতের নাজিরশাইল ও মিনিকেট ১৫ দশমিক ৯৪ শতাংশ, মাঝারিজাতের পাইজাম ও আটাশ ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ এবং মোটাজাতের স্বর্ণা ও চায়না ইরি চালের দাম ১০ দশমিক ৫৮ শতাংশ বেড়েছে। টিসিবির ঢাকা মহানগরীর দৈনিক খুচরা বাজার দরের তথ্য অনুযায়ী, সরু চাল ৭৫ থেকে ৮৫ টাকা, মাঝারি মানের চাল ৬০ থেকে ৭০ টাকা এবং মোটা চাল ৫৫ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।চলতি বছরের বোরো মৌসুমের শুরুতে চালের দাম কেজিপ্রতি ১০ থেকে ১৫ টাকা কমলেও ঈদুল আজহার পর জুন মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে ফের বাড়তে থাকে, বর্তমানে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে সর্বোচ্চ দামে বিক্রি হচ্ছে।
খাদ্যসচিব মো. মাসুদুল হাসান বলেন, চালের দাম বাড়ার পেছনে মৌসুমি ভারী বৃষ্টিপাতেরও প্রভাব রয়েছে। টিসিবির মাধ্যমে খোলা বাজারে চাল বিক্রি শুরু করেছে, পাশাপাশি ১৭ আগস্ট থেকে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি চালু হবে। এ বছর মাত্র ১৫ টাকা দরে ৫৫ লাখ পরিবার ছয় মাস ধরে মাসে ৩০ কেজি চাল পাবেন।
রাজধানীর সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার বাবুবাজারের ইসলাম রাইস এজেন্সির স্বত্বাধিকারী আমজাদ হোসেন বলেন, দেশের চালের বাজার চাতাল ব্যবসায়ীদের হাতে নেই। চালের বাজার করপোরেট হাউসগুলোর নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। এ কোম্পানিগুলো চালের ভরা মৌসুমেও চালের দাম বাড়ালে সরকার অজ্ঞাত কারণে নীরব ভূমিকা পালন করে। ঈদের পর বস্তায় ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে বাজারে চাল সরবরাহ করে। এটা খুবই রহস্যজনক। করপোরেট হাউসগুলোর রহস্যময় ভূমিকা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে সরকার যতই উদ্যোগ গ্রহণ করুক না কেন, বাজার স্থিতিশীল হবে না।
ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, বিশ্ববাজারে চালের দাম কমলেও বাংলাদেশে সেটা উল্টো রথে। এখন মিলমালিকদের আগের সেই সিন্ডিকেট চলেগেছে করপোরেট কোম্পানিগুলোর হতে। তারাই এখন চালের দাম কমা বুদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করছে। ।্র যাদের এই দাম নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব তারা এখন নিরব ভুমিকা পালন করছে। সরকারের উচিত দ্রুত সন,ময়ের ধ্যে এই দাম নিয়ন্ত্রণের উদ্রোগ নেওযা তা না হলে সাধরণ মানুষের কষ্ট বাড়বে।
তিনি আরো বলেন, সম্প্রতি সরকার চাল ৫ লাখ মে. টন আমদানির অনুমতি দিয়েছে। ২৪২ টি প্রতিষ্ঠানকে আমদানির ববাদ্দও নির্ধারণ করে দিলেও দেখা যাবে অনেক প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসায়ী চাল আমদানি করবেন না। এর মানে ব্যবসায়ীদের হাতে পর্যাপ্ত চাল মজুত আছে, তা উচ্চমূল্যে বিক্রি করতেই সরবরাহে সংকট তৈরি করে চালের দাম বাড়ানো হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, বিপুল মজুতের সক্ষমতা আছে করপোরেট মিলগুলোর, বাজার এখন তাদেরই দখলে। তারা কৃষকের থেকে চাল কিনে এরপরের সপ্তাহ থেকেই দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। একারণে গত কয়েক মৌসুমে ভরা মৌসুমেও চালের দাম বেড়েছে। সরকার এগুলো ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম মনে করেন, ফসল উৎপাদনের তথ্য ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে বলা হয়। তিনি বলেন,যদি ফলন ও আমদানির রেকর্ড হয়, তাহলে তো ঘাটতি থাকার কথা না। আবার যদি সরবরাহ ভালো থাকে, তাহলে নিশ্চয়ই বেসরকারি লেভেলে মজুতদারি করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে সরকারের তো আইন রয়েছে, সেগুলোর বাস্তবায়ন করতে হবে। কিন্তু তা করা হয় না। সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে প্রতিবছরই বাংলাদেশ চাল আমদানি করে থাকে।