তরিকুল ইসলাম সুমন
আমরা কতোভাবেই চিনি প্রভুভক্ত প্রাণী কুকুরকে। কারো কাছে গালি বা কারো কারো কাছে ঘৃণ্য প্রাণী। আজ এক বিশেষ বাংলাদেশী কুকুরের কথা বলবো।
বাংলাদেশের কুকুর হিসেবে খ্যাত সরাইল হাউন্ড ব্যাপক পরিচিত হলেও আজ এর অস্তিত্ব হুমকির মুখে। লম্বা, পাতলা গড়ন, সরু মাথা, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আর শিকারের অসাধারণ দক্ষতা এই কুকুরগুলোকে বিশেষত্ব দিয়েছে।
বহু শতাব্দী ধরে এই কুকুরগুলো আমাদের দেশের ঐতিহ্য বহন করে আসছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলা থেকে এই কুকুরের নাম এসেছে। আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত প্রজাতি না হওয়ায় এদের কোনো নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক নাম নেই। এটি মূলত একটি ঐতিহ্যবাহী জাত।
ধারণা করা হয়, মোঘল আমলে অথবা আরব বণিকদের মাধ্যমে এই কুকুরগুলো বাংলাদেশে আসে। এদের পূর্বপুরুষ হিসেবে গ্রেহাউন্ড এবং সাইটহাউন্ড কুকুরদের কথা বলা হয়, তবে এই প্রজাতির উৎপত্তি সম্পর্কে খুব বেশি নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। কিছু গবেষক বলেন সরাইল হাউন্ড, সালুকি (এক ধরণের সাইটহাউন্ড) এবং স্থানীয় বন্য কুকুরের ক্রস, যা ব্রিটিশ আমলে গ্রেহাউন্ডের সাথে যুক্ত হয়েছিল।
সরাইল হাউন্ড শারীরিক ভাবে লম্বা, রোগা, এদের বুক শক্তিশালী, কান তীক্ষ্ন এবং লোম দুই রঙের। এদের দৃষ্টিশক্তি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ এবং এরা শিকারের জন্য বিখ্যাত। সেনাবাহিনী, পুলিশ এবং পাহারাদার কুকুর হিসেবে এদের ব্যবহার করা হয়। এরা মালিকের প্রতি খুব অনুগত। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের বীর মুক্তিযোদ্ধা এম.এ.জি. ওসমানীরও দুটি সরাইল হাউন্ড ছিল, যার একটি দরজায় পাকিস্তানি আর্মির উপস্থিতি সম্পর্কে সতর্ক করে তাঁর জীবন রক্ষায় ভূমিকা রেখেছিল বলে জানা যায়।
ব্রিডার কুকুরের অভাবে অন্যান্য স্থানীয় জাতের কুকুরের সাথে সরাইল হাউন্ডের প্রজননের ফলে জাতটি বিশুদ্ধতা হারাচ্ছে। কিছু হিসাব অনুযায়ী, মাত্র কয়েক ডজন সরাইল হাউন্ড বেঁচে আছে। এদের পালন করা অনেক ব্যয়বহুল। একদিকে বাংলাদেশ ঘনবসতিপূর্ণ হওয়ায় কুকুর পালনের জমির যেমন অভাব রয়েছে, আরেকদিকে প্রজাতিটি সংরক্ষণে সরকারি উদ্যোগেরও অভাব রয়েছে।
১৯৭০-এর দশকে সরাইল হাউন্ড প্রজননের একটি ব্যর্থ চেষ্টার পর থেকে সরকার আর এদের সংরক্ষণে তেমন কোনো বরাদ্দ দেয়নি। তবে ব্যক্তি পর্যায়ে কিছু উদ্যোগ দেখা যায়। Sarail Hounds of Bangladesh ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমে কুকুর সম্পর্কিত তথ্য বিনিময় করে প্রজননের ব্যবস্থা করেন অনেকে।
একসময় শহরের প্রায় প্রতিটি পরিবারেই সরাইল হাউন্ড ছিল। কিন্তু, এখন মূলত পাহারা দেওয়ার জন্য বা বংশপরম্পরায় সরাইল হাউন্ড পালনের পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য এগুলো রাখা হয়। তবে লালন-পালনের খরচ দরিদ্র পরিবারগুলোর ওপর একটা বড় চাপ।
অনেকে প্রতিবেশীদের কুকুরের সাথে তাদের সরাইল হাউন্ডের ক্রস করে বাচ্চা বিক্রি করেন। প্রতিটি বাচ্চা বিক্রি করে তারা মোটা দাগে ৫০,০০০ টাকা মত পান, যা দিয়ে তারা কুকুরগুলোর জন্য মুরগি আর গরুর মাংস কেনেন।
এই প্রজাতিকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে হলে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সচেতনতাও জরুরি। অর্থনৈতিক সহায়তা, প্রজনন কেন্দ্র স্থাপন এবং জেনেটিক এক্সপার্টদের গবেষণা কার্যক্রমের মাধ্যমে এদের রক্ষা করা সম্ভব। এই কুকুরগুলো শুধু একটি প্রজাতি নয়, আমাদের ইতিহাসের অংশ।