সুমন ইসলাম :
লাম্পি স্কিন ডিজিসের (এলএসডি) প্রতিষেধক তৈরির এলএসডি ভ্যাকসিন সিড উৎপাদন করেছে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিটিউট (বিএলআরআই)। আমাদের দেশে এ রোগ দেখা যাওয়ার সাত বছর পর ভ্যাকসিন বীজ উৎপাদন করলো সরকারি এ প্রতিষ্ঠান। দ্রুত এ ভ্যাকসনি উৎপাদন করে সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে পারলে বৈদেশিক নির্ভরতার পাশাপাশি খামারিদের ২ হাজার কোটি টাকার সম্পদহানী রোধ করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞরা।
বিএলআরআই সূত্র জানায়, আগামীকাল রাজধানীর একটি হোটেলে লাম্পি স্কিন ডিজিজের (এলএসডি) প্রতিষেধক তৈরির এলএসডি ভ্যাকসিন সিড হস্তান্তর করা হব। এ উপলক্ষ্যে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার।
বিএলআরআই এর ট্রান্সবাউন্ডারি এ্যানিমেল ডিজিজ রিসার্স সেন্টারের উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. আনোয়ার হোসেন জানান, আমাদের দেশে ২০১৯ সালে এ রোগের প্রাদুভার্ব দেখা গেলেও ২০২১ সালে এর রোগের প্রতিষেধক উৎপাদনের কাজ শুরু করে বিএলআরআই। তারা বীজ উৎপাদনের পর থেকে এ পর্যন্ত ২০ হাজার টিকা উৎপাদন করে গবাদি পশুকে প্রয়োগ করছে। যা কার্যকরি হিসেবে প্রমানিত হওয়ায় আনুষ্ঠানিক হস্তান্তর করা হচ্ছে। এখন সময় এসেছে ব্যপক আকারে এই টিকা উৎপাদন করার।
তিনি আরো বলেন, প্রতিবছর বিদেশ থেকে কোটি কোটি টাকার ভ্যাকসিন আমদানি করা হয়। এতে করে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হচ্ছে। অপরদিকে আমাদের পরিবেশ ও আবহাওয়া অনুকূল নয় যে দেশ থেকে এ ভ্যাকসিন আমদানি করা হচ্ছে। ফলে আমদানি করা ভ্যাকসিনে ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। অপরদিকে আমদানিকৃত ভ্যাকসিন ২৫০ থেকে ৩০০ টাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে। দেশে উৎপাদন হলে এ টিকা সর্বোচ্চ ৫০ থেকে ১০০ টাকায় পাওয়া যাবে।
বাংলাদেশ ডেইরী এন্ড ফ্যাটেনিং ফার্মার্স এসোসিয়েশনের (বিডিএফএফএ) সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমরা অনেকদিন থেকেই এ বিষয়টি শুনে আসছি। কিন্তু ভ্যাকসিন উৎপাদনের কোনো খবর অসছে না। যদি টিকার বীজ উৎপাদন ও হস্তান্তর করা হয় তবে সেটি খামারিদের জন্য খুশির সংবাদ। এটি হস্তান্তর করলেই হবে না, দ্রুত এর ভ্যাকসিন উৎপাদন করে সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে হবে। এ রোগের কারণে প্রতি বছর খামারিদের লাখ লাখ টাকার ক্ষতি হচ্ছে। এমন কোনো খামারি নাই যে, এ রোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। সরকারের উচিৎ কালবিলম্ব না করে দ্রুত সময়ের মধ্যে টিকা উৎপাদনে জোর দেয়া এবং তা ম্যাসিভ আকারে ছড়িয়ে দেয়া।
চিকিৎসকরা বলছেন, ভাইরাসজনিত এ রোগ মশা-মাছি ও কীটপতঙ্গের মাধ্যমে গরুর শরীরের ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্ত পশুর শরীরের তাপমাত্রা ১০৩ থেকে ১০৫ ডিগ্রিতে বেড়ে দাঁড়ায়। প্রচণ্ড জ্বরের কারণে খাওয়া বন্ধ করে দেয়। পাশাপাশি গায়ে দেখা দেয় বসন্তের মতো গুটি গুটি চাকা। সেখানে পুঁজ জমে ফেটে গিয়ে মাংস খসে পড়ে। কমে যায় দুধ উৎপাদনও।
সংশ্লিষ্টদের ধারণা, প্রতিবছর ১৫-২০ লাখের বেশি গরু-মহিষ লাম্পিতে আক্রান্ত হয়। এরই মধ্যে মৃত্যু হয়েছে কয়েকশ গরুর, গর্ভপাতের সংখ্যা তারও কয়েকগুণ। সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ক্ষতির শঙ্কা দুই হাজার কোটি টাকা, যা এ খাতের জন্য অশনিসংকেত। রোগটির পর্যাপ্ত প্রতিষেধক ও চিকিৎসা না থাকায় দুশ্চিন্তায় রয়েছেন খামারিরা।
প্রাণি সম্পদ আধিদপ্তরের গবেষক ডা. ফয়সল তালুকদার বলেন, গবাদি পশুতে লাম্পি অনেক ক্ষতি করে। উৎপাদনও কমে য়ায়। তারপরেও সরকারি নানা উদ্যোগের ফলে আমাদের দেশে ম্যাসিভ আকারে ছড়িয়ে পড়েনি। আমাদের দেশে বর্তমানে আমাদানিকৃত ভ্যাকসিন ও গোট পক্সের টকিা দিয়ে চিকিৎস্যা চলছে। বিএলআরআইয়ের উৎপাদিত বীজের মাধ্যমে ভ্যাকসিন উৎপাদন হলেও তা আমাদের দেশের প্রাণিসম্পদের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমকিা রাখবে।
প্রাণিসম্পদ অধিদফতর বলছে, দেশে গো-বসন্ত বা লাম্পি স্কিন ডিজিজ প্রথম শনাক্ত হয় ২০১৯ সালের ১২ জুলাই চট্টগ্রামে। এরপরই মাঠে নামে অধিদপ্তরের তদন্ত টিম। তখন দেশের ১২ জেলায় ৪৮ হাজার গরুর মধ্যে এ রোগের লক্ষণ খুঁজে পাওয়া যায়। বিষয়টি প্রাণিস্বাস্থ্য সম্পর্কিত বিশ্ব সংস্থা ওআইইকে অবহিত করে সরকার। একইসাথে দেশব্যাপী খামারিদের সতর্ক করা হয়। কিন্তু কোনোভাবেই রোগটির বিস্তার ঠেকানো সম্ভব হয়নি। প্রতিনিয়ত আক্রান্ত হচ্ছে নতুন নতুন খামার।