কৃষি সংবাদ প্রতিনিধি জয়পুরহাট:
হিমাগারে যে আলু আছে, সবই বড় ব্যবসায়ীদের। বিক্রির জন্য কৃষকের এক ছটাক আলুও নেই। গত দুই দিন ধরে সরকারি লোকজন হিমাগারগুলোয় আসছেন। দাম নিয়ে সবার সঙ্গে কথা বললে কী হবে, সে সময় ব্যবসায়ীরা থাকেন না। এখন তো ঠিকই আসছেন। আর কয়েক দিন আগে এলে আলুর দাম এত বাড়ত না।’ কথাগুলো জয়পুরহাটের কালাইয়ে হিমাগার এলাকা মোলামগাড়ী হাটের কৃষক আফজাল হোসেনের।
আলুর দামে হঠাৎ করে অস্থিরতা দেখা দেওয়ায় হিমাগারে তদারকি শুরু করেছে প্রশাসন। তবে তারা অভিযানে গেলে সটকে পড়ছেন মজুতদাররা। তখন বেচাকেনা বন্ধ থাকে। আবার তারা চলে গেলেই বেচাকেনা শুরু হচ্ছে। আলু উৎপাদনে পরিচিত জেলা জয়পুরহাটে গত দুই সপ্তাহ ধরে হিমাগার গেটে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে আলু। এ পরিস্থিতিতে অভিযানে গেলে প্রশাসনের লোকজনের সঙ্গে চোরপুলিশ খেলা চলছে মজুতদারদের।
অভিযোগ উঠেছে, পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও লাফিয়ে বাড়ছে আলুর দাম। বেশি লাভের আশায় মৌসুমের শুরুতে কৃষকদের কাছ থেকে ১৪-১৫ টাকা কেজি দরে কিনে হিমাগারে সংরক্ষণ করেছেন মজুতদাররা। সংকট সৃষ্টি করে হিমাগার গেটে কারসাজির মাধ্যমে বিভিন্ন জাতের আলু পাইকারিতেই প্রতি কেজি ৬০-৬১ টাকা দরে বিক্রি করছেন। আলুর বাজার অস্থিতিশীল হওয়ার পরও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো তদারকি ছিল না বলে অভিযোগ ভোক্তা ও কৃষকদের।
‘হিমাগার গেটেই কারসাজি, ১৫ টাকার আলু ৬৫’ শিরোনামে গত ৪ নভেম্বর সমকালে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এর পর প্রশাসনের টনক নড়ে। সভা করে তারা বাজার তদারকিতে নেমেছে। এরই মধ্যে নতুন জেলা প্রশাসক আফরোজা আকতার চৌধুরী গত রোববার যোগদান করেছেন। পরে বুধবার তাঁর সম্মেলন কক্ষে বাজার নিয়ন্ত্রণে হিমাগার মালিক, ব্যবস্থাপক, ব্যবসায়ী, ইউএনও, কৃষি কর্মকর্তা ও বিপণন অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের নিয়ে সভা করেন। কারসাজিতে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
এরই মধ্যে বুধবার থেকে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা হিমাগার ও বাজার তদারকি শুরু করেছেন। মজুতদারদের তালিকা সংগ্রহের পর হিমাগার মালিক ও ব্যবস্থাপকদের সতর্ক করে দিয়েছেন তারা। তবে হিমাগার গেটে প্রশাসনের লোকজনের উপস্থিতি টের পেলেই মজুতদাররা সরে যান। কমিশন ব্যবসায়ী সাইদুর রহমানের ভাষ্য, ‘আমি কমিশনে দেশের বিভিন্ন আড়তে আলু পাঠাই। হিমাগারগুলোয় যে পরিমাণ আলু আছে, তা মজুতদার ব্যবসায়ীদের কাছে জিম্মি। ফলে দাম আকাশছোঁয়া। কয়েক দিন ধরে প্রশাসনিক নজরদারি জোরদার হওয়ায় বেচাকেনা কমেছে। মজুতদারদের মোবাইল ফোনেও পাওয়া যাচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গতকাল শনিবার হিমাগার গেটে পাইকারি পর্যায়ে বিভিন্ন জাতের আলু প্রতি কেজি ৬০ থেকে ৬১ টাকায় বিক্রি হয়েছে। আর খুচরা বাজারে ৬৮ থেকে ৭০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। দুই সপ্তাহ আগে হিমাগার গেটে পাইকারি প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে ৪৫ থেকে ৪৭ টাকা। আর খুচরা বাজারে বিক্রি হয় ৫৩ থেকে ৫৫ টাকায়।
কালাই পৌর শহরের মুন্সিপাড়ার বাসিন্দা হাবিবুল হাসান। গতকাল শনিবার তিনি বাজার করতে যান কালাই হাটে। তাঁর ভাষ্য, দুই সপ্তাহ আগে এক কেজি কির্ডিলাল আলু কিনেছেন ৪৫ টাকায়। এখন সে আলু কিনতে হচ্ছে ৭০ টাকা কেজি। অথচ মৌসুমের শুরুতে এক কেজি আলু ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করেছেন ১৫ টাকায়। এই যদি বাজারের অবস্থা হয়, তাহলে কৃষকরা যাবে কোথায়।
যদিও হিমাগারে এখন বেশি আলু নেই বলে দাবি শিমুলতলী আরবি হিমাগারের সহকারী ব্যবস্থাপক আব্দুল লতিফের। তিনি জানান, যাদের মজুত আছে, প্রশাসনের লোকজন এসে তাদের ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিচ্ছেন। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মেহেদী হাসান বলেন, জেলা প্রশাসকের নির্দেশে বাজার নিয়ন্ত্রণে কৃষি বিপণনসহ বিভিন্ন দপ্তর নিয়মিত তদারকি করছে। দ্রুত বাজার নিয়ন্ত্রণে আসবে।
জেলা প্রশাসক আফরোজা আকতার চৌধুরী বলেন, বাজার নিয়ন্ত্রণে হিমাগার মালিক ও ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। এর পরও যারা কারসাজির সঙ্গে জড়িত থাকবেন, তাদের আইনের আওতায় আনার জন্য বলা হয়েছে।