কৃষি সংবাদ প্রতিবেদক:
পার্বত্য চট্টগ্রামের কৃষকদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও দুর্গম যাতায়াত ব্যবস্থার কষ্টের কথা বিবেচনা করে তাদের উৎপাদিত পণ্যের উপযুক্ত মূল্য নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন। তিনি বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের কৃষকদের কৃষি ফলন ও কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণে সহজ যাতায়াত ব্যবস্থার অপ্রতুলতা রয়েছে। অনেক কষ্টের বিনিময়ে তারা পণ্য বাজারে নিয়ে আসেন। তাই তিনি সংশ্লিষ্টদের প্রতি কৃষকদের পণ্যের মূল্যের সাথে আনা-নেওয়ার অতিরিক্ত পারিশ্রমিক যোগ করে কৃষকদের কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহ করার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করার অনুরোধ জানিয়েছেন।
গতকাল পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (বার্ড)-এর উদ্যোগে আয়োজিত ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের পল্লী অঞ্চলের কৃষি পণ্যের সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন বিষয়ক প্রকল্প এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে বার্ডের আউটরিচ সেন্টার প্রতিষ্ঠা’ শীর্ষক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী এ আহ্বান জানান। সভায় সভাপতিত্ব করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের ফল ও সবজি বাজারজাতকরণ ব্যবস্থাকে আধুনিক ও কার্যকর করতে এ প্রকল্পটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী উদ্যোগ। তিনি উল্লেখ করেন, সরাসরি বৃহৎ পরিসরে প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিবর্তে বার্ড প্রাথমিকভাবে এটিকে একটি প্রায়োগিক গবেষণা (Pilot Research) হিসেবে গ্রহণ করেছে, যা একটি বাস্তবসম্মত ও দূরদর্শী পদক্ষেপ।
মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন আশা প্রকাশ করেন, বার্ড সমবায়ভিত্তিক কৃষিপণ্য সাপ্লাই চেইন মডেল গড়ে তোলার মাধ্যমে পার্বত্য অঞ্চলের উৎপাদনশীল খাতের সাথে সম্পৃক্ত সাধারণ মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। তবে এ ধরনের উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর ও অংশীজনদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি। এ বিষয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ বার্ডকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করবে।
সভার শুরুতে বার্ডের মহাপরিচালক সাইফউদ্দীন আহমেদ সভার এজেন্ডা অনুযায়ী প্রকল্পের সার্বিক ধারণা উপস্থাপন করেন। পরবর্তীতে প্রকল্পের মূল ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন কুমিল্লার বার্ড-এর পরিচালক ফৌজিয়া নাসরিন সুলতানা।
সভায় জানানো হয়, প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য হলো পার্বত্য চট্টগ্রামের কৃষিজ পণ্যের পোস্ট-হারভেস্ট (ফসল কাটার পরবর্তী) ক্ষতি হ্রাস করা, কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ এবং তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা সৃষ্টি করা। আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষকদের আয় বৃদ্ধি ও জীবনমান উন্নয়নের একটি টেকসই মডেল তৈরি করাই এ প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য।
এ প্রকল্পের আওতায় পার্বত্য চট্টগ্রামে উৎপাদিত কৃষিজ পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে ব্লকচেইনভিত্তিক সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনা প্রবর্তনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া, ৯৫০জন কৃষককে জৈব পদ্ধতিতে চাষাবাদ ও রপ্তানিযোগ্য কৃষিপণ্য উৎপাদনের উত্তম চর্চা বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে। শিক্ষানবিশ কর্মসূচির মাধ্যমে ৫০ জন তরুণ কৃষি উদ্যোক্তাকে সমবায়ভিত্তিক সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনা ও বাজারজাতকরণ বিষয়ে দক্ষ করে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কৃষকদের অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় আনতে সমিতিভিত্তিক সঞ্চয় সহায়তা প্রদান, ক্ষুদ্র সঞ্চয়ে উদ্বুদ্ধকরণ এবং কৃষক ও তরুণ উদ্যোক্তাদের জীবনমান উন্নয়ন ও সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়নের পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়।
সভায় পার্বত্য চট্টগ্রামে বার্ডের আউটরিচ সেন্টার প্রতিষ্ঠা সংক্রান্ত গবেষণা প্রস্তাবনায় স্থানীয় পল্লী উন্নয়ন চ্যালেঞ্জ ও প্রয়োজনসমূহ চিহ্নিত করে গবেষণা ও প্রায়োগিক কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। তবে সভায় এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত না নিয়ে ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় পর্যালোচনার মাধ্যমে পুনরায় বিবেচনার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
সভায় উপস্থিত বক্তারা প্রকল্পটিকে সময়োপযোগী ও বাস্তবমুখী উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এ প্রকল্প পার্বত্য অঞ্চলের কৃষকদের জন্য আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করবে এবং কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি, বাজার সম্প্রসারণ ও টেকসই উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সভায় আরো উপস্থিত ছিলেন পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের অতিরিক্ত সচিব প্রদীপ কুমার মহোত্তম, বার্ডের মহাপরিচালক সাইফউদ্দীন আহমেদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোঃ মনিরুল ইসলাম, যুগ্মসচিব কংকন চাকমা, অতুল সরকার, মমিনুর রহমান, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান শেখ ছালেহ আহাম্মদ (যুগ্ম-সচিব), বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক থানজামা লুসাই, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য শ্রী ফদাং তাং রান্দাল, রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মোহাম্মদ রিজাউল করিম, টিআরএটিএফ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রাশেদুল হক, ওমেগা লজিস্টিক ও সাপ্লাই চেইন বিশেষজ্ঞ জিয়া করিম, বার্ডের যুগ্ম পরিচালক আযমা মাহমুদা এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাবৃন্দ।