1. admin@krishisangbad.com : admin :
  2. siddique149096@bsdi-bd.org : md abu bakar siddique rasim : md abu bakar siddique rasim
সাপের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন রমুলাস হুইটেকার - কৃষি সংবাদ
রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৫০ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে জলবায়ু সহনশীলতা বাড়াতে মন্ত্রণালয়ের সাথে আইসিসিসিএডির সমঝোতা স্মারক সই দেশীয় মাছ সংরক্ষণ এবং মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিতে কাজ করছে সরকার: মৎস্য প্রতিমন্ত্রী প্রান্তিক খামারিদের স্বার্থে কেন্দ্রীয় মুরগি খামারে উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ টুকুর ১১৭ টি ফিড মিলকে নোটিশ করেছে সরকার রাজধানীর সাত স্থানে ককটেল বিষ্ফোরণসহ বাসে আগুন নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার বন্ধের আহ্বান মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রীর ভেজালমুক্ত পণ্য নিশ্চিত করতে ডিজিটাল সেবা বাড়ানোর তাগিদ বাণিজ্যমন্ত্রীর রফতানিমুখী কৃষিজ পণ্য উৎপাদনে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির তাগিদ টিসিবির জন্য ১০ হাজার টন মসুর ডাল কিনবে সরকার সৌদি আরব থেকে ১৯৪ কোটি টাকার ইউরিয়া আমদানির অনুমোদন

সাপের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন রমুলাস হুইটেকার

  • প্রকাশের সময় : সোমবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
  • ১৫৬ বার পঠিত

কৃষি সংবাদ ডেস্ক :

পেরিয়ারের শান্ত পানিতে ভাসছিল একটি নৌকা। আচমকা বনের ধার ঘেঁষে ছায়ার মতো নিঃশব্দে বেরিয়ে এলো একটি বিশাল বাঘ। ১৯৫৭ সালে ভারতের কেরালা ভ্রমণে আসা ১৩ বছরের এক কিশোরের জন্য সেই মুহূর্তটি ছিল রীতিমতো রোমাঞ্চকর। সে সময় বন্যপ্রাণী কেবল অভয়ারণ্যের চার দেয়ালে বন্দি ছিল না; বরং তা ছিল দৃশ্যমান, একদম হাতের নাগালে এবং প্রাত্যহিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

ক্ষণস্থায়ী সেই দেখার রেশ কিশোর রমুলাস হুইটেকারের মনে গেঁথে গিয়েছিল সারাজীবনের জন্য। পরবর্তীতে তিনি ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী বন্যপ্রাণী সংরক্ষণবাদী হয়ে ওঠেন। মূলত সেই দিনের সেই অভিজ্ঞতাই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল—মানুষ যে প্রাণীগুলোকে ভয় পেত, তাদের জীবন রহস্য বোঝা এবং তাদের রক্ষায় নিজেকে সপে দেওয়ার এক মহৎ যাত্রার সূচনা হয়েছিল সেদিনই।

হুইটেকারের প্রথম কেরালা সফর ছিল মূলত পারিবারিক ভ্রমণের অংশ। তার বোনের হাইস্কুল গ্র্যাজুয়েশন উপলক্ষে আয়োজিত এই সফরের তালিকায় ছিল কোচি শহর। সেখানে তারা উঠেছিলেন ওই সময়ের সেরা ‘মালাবার হোটেলে’। পেরিয়ারের মতো নদীগুলোতে নৌকায় ঘুরে বেড়ানো তখন বেশ জনপ্রিয় ছিল, আর বন্যপ্রাণী চোখে পড়াও ছিল খুব সাধারণ ব্যাপার।

স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে হুইটেকার বলেন, গাউর (বন গরু) আর হরিণ খুব সহজেই চোখে পড়ত। তখনো শিকার বৈধ ছিল, আর বাঘেরা অবাধে বিচরণ করত বনের আনাচে-কানাচে। ওই সফরে কোনো রাজগোখরা (কিং কোবরা) আমি দেখিনি ঠিকই, কিন্তু খুঁটিয়ে দেখার অভ্যাসটা ততদিনে মনের ভেতরে গেঁথে গিয়েছিল।

তবে হুইটেকারের বন্যপ্রাণীর প্রতি এই অদম্য টান জন্মেছিল আরও অনেক আগে, ভারত থেকে বহুদূরে। যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরাঞ্চলীয় নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যে বড় হওয়ার সময় হুইটেকার একবার দেখেছিলেন, ভয়ে প্রতিবেশীর ছেলেরা একটি সাপকে পিটিয়ে মারছে। সেই ঘটনাই হয়তো তার মনে পশু-পাখির প্রতি এক অন্যরকম সহমর্মিতা তৈরি করেছিল।

হুইটেকার বলেন, সাপের ব্যাপারে অন্য বাচ্চাদের চেয়ে আমি একটু বেশিই জানতাম, আর সেটাই পার্থক্য গড়ে দিয়েছিল। তার মাও ছেলের এই কৌতূহলকে দমিয়ে না রেখে বরং উৎসাহ দিতেন। মা তাকে সাপের ওপর একটি বই কিনে দিয়েছিলেন, যা তার মনের ভয় দূর করে জ্ঞান অর্জনে সাহায্য করেছিল। পরবর্তীতে তিনি যখন একবার একটি জ্যান্ত সাপ বাড়িতে নিয়ে আসেন, তার মা আতঙ্কিত না হয়ে বরং সেটির সৌন্দর্যের প্রশংসা করেন। ফেটে যাওয়া কাঁচের পুরোনো একটি অ্যাকোরিয়ামই হয়ে ওঠে সেই সাপের অস্থায়ী আবাস। এভাবেই অজান্তেই সরীসৃপের সঙ্গে হুইটেকারের আজীবনের বন্ধুত্বের প্রথম ধাপটি শুরু হয়, যা ১৯৫০-এর দশকে তার পরিবার ভারতে চলে আসার পর আরও গভীর হয়েছিল।

হুইটেকারের জীবনসঙ্গী এবং তার আত্মজীবনী ‘স্নেকস, ড্রাগস অ্যান্ড রক এন রোল: মাই আর্লি ইয়ারস’-এর সহ-লেখক জানকি লেনিন জানান, বইটি লিখতে গিয়ে তিনি হুইটেকারের এই অসাধারণ জীবনকে আরও নিবিড়ভাবে বুঝতে পেরেছেন। জানকির মতে, হুইটেকারের ছাত্রজীবন মোটেও প্রথাগত ছিল না। বনে জঙ্গলে ক্যাম্পিং করা, হ্রদে মাছ ধরা—এমনকি একবার নিজের বিছানার নিচে অজগর খুঁজে পাওয়ার মতো রোমাঞ্চকর সব অভিজ্ঞতায় ঠাসা ছিল তার শৈশব। একঘেয়েমি বলতে তার জীবনে কিছু ছিল না। ক্লাসরুমের পড়াশোনায় যখন মন বসতো না, অনায়াসেই সেখান থেকে বেরিয়ে বাইরের জগতের সন্ধানে চলে যেতেন তিনি। নিজের জীবনের সঙ্গে তুলনা করতে গিয়ে লেনিন বলেন, হুইটেকার যেন ‘এক জীবনেই ছয়-সাতটি জীবন পার করেছেন।’

প্রথাগত পুঁথিগত বিদ্যা কখনোই তাকে টানতে পারেনি। স্কুল শেষ করে কলেজে ভর্তি হলেও রমুলাস হুইটেকার দ্রুতই বুঝতে পারেন, শ্রেণিকক্ষের চার দেয়াল তার বাস্তবধর্মী শেখার আগ্রহ মেটাতে পারছে না। তার প্রকৃত শিক্ষার হাতেখড়ি হয় মিয়ামি সারপেন্টারিয়ামে কিংবদন্তি সাপ সংগ্রাহক বিল হাস্টের অধীনে। হাস্ট ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে সাপের বিষ সংগ্রহের পথপ্রদর্শক। তার সান্নিধ্যে থেকে হুইটেকার বিষধর সাপ সামলানো, খাঁচায় তাদের যত্ন নেওয়া এবং চিকিৎসার কাজে সাপের বিষ সংগ্রহের জটিল কৌশলগুলো রপ্ত করেন। বিল হাস্টের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, বিল হাস্ট ছিলেন আমার গুরু। তিনি আমাকে কেবল কৌশল নয়, বরং সাপের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে শিখিয়েছিলেন।

ভারতবর্ষে ফিরে হুইটেকার একটি স্বচ্ছ ধারণা নিয়ে কাজ শুরু করেন। তিনি অনুভব করেছিলেন, ভারতে এমন একটি জায়গা প্রয়োজন যেখানে মানুষ অন্ধভয় কাটিয়ে বৈজ্ঞানিক উপায়ে সাপের ব্যাপারে জানতে পারবে। সেই চিন্তা থেকেই ১৯৬৯ সালে যাত্রা শুরু করে ‘মাদ্রাজ স্নেক পার্ক’। শুরুতে দর্শনার্থীরা বেশ সংশয় নিয়ে আসতেন। কেউ আসতেন রোমাঞ্চের আশায়, কেউ বা থাকতেন বিপদের আশঙ্কায়। এমনকি হুইটেকারকেও অনেকে একজন ‘খামখেয়ালি বিদেশি’ হিসেবে দেখতেন। কিন্তু এই পার্কের উদ্দেশ্য কেবল বিনোদন ছিল না, এটি ছিল একটি শিক্ষামূলক পরীক্ষা। সাধারণ মানুষ প্রথমবারের মতো খুব কাছ থেকে সাপ দেখার সুযোগ পেল, বিভিন্ন প্রজাতি চিনতে শিখল এবং বুঝতে পারল যে বেশিরভাগ সাপই আসলে মানুষের ক্ষতি করতে চায় না।

বিগত কয়েক দশকে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে রমুলাস হুইটেকারের কাজের প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। আজ ভারতে হাজার হাজার ‘স্নেক রেসকিউয়ার’ বা সাপ উদ্ধারকারী তৈরি হয়েছে, যা হুইটেকার ইতিবাচক দৃষ্টিতেই দেখছেন। তবে এই অগ্রগতির পাশাপাশি কিছু শঙ্কাও প্রকাশ করেছেন তিনি। তার মতে, সাপ উদ্ধার কার্যক্রম যেমন সাধারণ মানুষের সাপ মেরে ফেলার প্রবণতা কমিয়ে এনেছে, তেমনি ক্ষেত্রবিশেষে এটি এখন কেবল ‘লোকদেখানো’ কর্মকাণ্ডে পরিণত হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে কেরালা মডেলের ভূয়সী প্রশংসা করেন তিনি। কেরালায় সাপ উদ্ধারের কাজটিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে। সেখানে উদ্ধারকারীদের নিবন্ধন করা, পরিচয়পত্র দেওয়া এবং একটি অনলাইন ডাটাবেস বা তথ্যভাণ্ডার রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। এর ফলে পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়েছে। কেরালার এই মডেলটি বর্তমানে কর্ণাটকে অনুসরণ করা হচ্ছে এবং তামিলনাড়ুতেও এটি চালুর প্রক্রিয়া চলছে।

সাপে কাটা বা ‘স্নেকবাইট’ এখনো ভারতের অন্যতম বড় এক স্বাস্থ্য সংকট, যা দীর্ঘকাল ধরেই উপেক্ষিত। কয়েক দশক ধরে সরকারি পরিসংখ্যানে দাবি করা হতো যে, ভারতে প্রতি বছর সাপে কেটে মারা যান প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন। কিন্তু দেশজুড়ে পরিচালিত ‘মিলিয়ন ডেথস স্টাডি’র এক ভয়াবহ চিত্র সামনে এনেছে। মানুষের জবানবন্দি বা ‘ভারবাল অটোস্পসি’র ওপর ভিত্তি করে চালানো সেই গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি বছর ভারতে সাপে কেটে মৃত্যুর সংখ্যা ৫০ হাজারেরও বেশি। আর আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটে প্রায় ১০ লাখ। অনেক ভুক্তভোগীই শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে পৌঁছাতে পারেন না; হয় তারা পথেই মারা যান, অথবা আধুনিক চিকিৎসার বদলে কবিরাজি বা ঝাড়ফুঁকের মতো আদিম চিকিৎসার দ্বারস্থ হন।

রমুলাস হুইটেকারের মতে, এই সংকট সমাধানের মূল মন্ত্র হলো ‘সতর্কতা’। তিনি বলেন, সাপের কামড় থেকে বাঁচতে সচেতনতাই সবচেয়ে বড় অস্ত্র। রাতে চলাচলের সময় টর্চলাইট ব্যবহার করা, জুতো পরা কিংবা পাম্প হাউসের মতো জায়গাগুলোতে সাবধানে চলাচলের মতো সাধারণ কিছু সতর্কতা অবলম্বন করলে সাপে কাটার ঝুঁকি অনেকখানি কমিয়ে আনা সম্ভব। তার মতে, ইদানিং সাপে কাটার খবর বেশি শোনা যাচ্ছে কারণ মানুষের সচেতনতা বেড়েছে এবং ঘটনার নথিবদ্ধকরণ বা রিপোর্টিং আগের চেয়ে উন্নত হয়েছে। তবে সাপে কাটাকে কোনো ‘অলৌকিক’ বা সাংস্কৃতিক বিষয় হিসেবে না দেখে একে একটি ‘মেডিকেল ইমার্জেন্সি’ বা জরুরি চিকিৎসা সংকট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বাস্তবসম্মত এবং বিজ্ঞানভিত্তিক সমাধানের প্রতি হুইটেকারের যে অগাধ বিশ্বাস, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো তামিলনাড়ুর ইরুলা আদিবাসী সম্প্রদায়ের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের পথচলা। বংশপরম্পরায় ইরুলারা সাপের চামড়া সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করতো। কিন্তু সাপের চামড়া ব্যবসা নিষিদ্ধ হওয়ার পর রাতারাতি তারা কর্মহীন হয়ে পড়ে। এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে হুইটেকার এক যুগান্তকারী মডেল তৈরি করেন। তার উদ্যোগে ইরুলা সাপ শিকারিরা এখন সাপ ধরে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সেগুলোর বিষ সংগ্রহ করেন এবং পরে সাপগুলোকে আবার বনেই ছেড়ে দেওয়া হয়। এই সংগৃহীত বিষ থেকেই তৈরি হয় জীবন রক্ষাকারী ‘অ্যান্টিভেনোম’, যা সরবরাহ করা হয় বিভিন্ন ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানিতে।

ইরুলাদের অবদান সম্পর্কে রমুলাস হুইটেকার বলেন, “তারা লাখ লাখ মানুষের জীবন রক্ষা করছে।” বর্তমানে প্রায় ৩৫০টি ইরুলা পরিবার ভারতের পুরো অ্যান্টিভেনম চাহিদার যোগান দিচ্ছে। হুইটেকারের মতে, এটিই ভারতের একমাত্র প্রকৃত উদাহরণ যেখানে বন্যপ্রাণীর টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত হয়েছে। বনের প্রাণিকুল ধ্বংস না করেই মানুষ এবং বন্যপ্রাণী উভয়ই এর সুফল পাচ্ছে।

বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে মানুষ ও প্রাণীর দ্বন্দ্ব। বিশ্বজুড়ে যেখানে বন্যপ্রাণী হুমকির মুখে, সেখানে ভারতে বাঘ, চিতাবাঘ এবং কুমিরের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বৈশ্বিক মানদণ্ডে এটি একটি বিশাল সাফল্য হলেও, এর একটি ভিন্ন পিঠও আছে। বর্তমানে এসব প্রাণীর বড় একটি অংশ সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বাইরে বসবাস করছে। বিশেষ করে চিতাবাঘ এখন লোকালয় সংলগ্ন কৃষি জমিতে নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে। আখের ক্ষেতে তারা শাবক লালন-পালন করছে এবং ছোট প্রাণী বা বেওয়ারিশ কুকুর খেয়ে বেঁচে থাকছে।

চিতাবাঘের এই বদলে যাওয়া জীবন নিয়ে হুইটেকার ব্যাখ্যা করেন, “আমরা যতটা মনে করি, চিতাবাঘের বেঁচে থাকার জন্য বনের প্রয়োজনীয়তা ঠিক ততটা নয়। তারা মানুষের পাশাপাশি মানিয়ে নিয়ে বেঁচে থাকতে শিখে গেছে।”

মানুষের আতঙ্ক যখন বন্যপ্রাণীকে বন্দি বা স্থানান্তর করার পর্যায়ে চলে যায়, তখনই বাড়ে বিপত্তি। হুইটেকারের মতে, এ ধরনের হস্তক্ষেপ অনেক সময় সংঘাতকে আরও উসকে দেয়। নিজের জীবনের একটি অভিজ্ঞতা থেকেই এই শিক্ষা পেয়েছিলেন তিনি। চেন্নাইয়ের কাছে নিজের ছোট খামারে একবার চিতাবাঘের আক্রমণে একটি কুকুর হারান হুইটেকার। প্রথম দিকে বন বিভাগকে ডাকার কথা ভাবলেও পরক্ষণেই তার উপলব্ধি হয়, “আমরাই তো ওর এলাকায় ঢুকে পড়েছি, ও তো আর আমাদের এলাকায় আসেনি।” এরপর রাতে কুকুরদের ঘরের ভেতরে রাখার মতো সাধারণ কিছু সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ায় কোনো বন্যপ্রাণীর ক্ষতি ছাড়াই সমস্যার সমাধান হয়।

জানকি লেনিনও মনে করেন মানুষ ও বন্যপ্রাণীর এই দ্বন্দ্ব নতুন কিছু নয়, তবে এর ধরন বদলেছে। আগে স্থানীয় মানুষ নিজেরাই এসব পরিস্থিতি সামাল দিত। লেনিন বলেন, “আইন সেই স্বাধীনতা কেড়ে নিয়েছে, কিন্তু রাষ্ট্র এই সংকট সমাধানের দায়িত্বটুকু ঠিকমতো পালন করেনি।” তার দাবি, বর্তমান সময়ের অনেক দ্বন্দ্বই আসলে রাষ্ট্রসৃষ্ট, বিশেষ করে হাতিদের ক্ষেত্রে। হাতিদের বিচরণ করতে হয় বিশাল এলাকায় এবং প্রয়োজন হয় প্রচুর খাদ্যের। বনভূমি ধ্বংস হওয়ার ফলে সহাবস্থানের পুরো দায়ভার এসে পড়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর, অথচ এই সংকট মোকাবিলায় তাদের সক্ষমতা সবচেয়ে কম।

ফসলি জমিতে বন্যপ্রাণীর হানা দেওয়ার ঘটনাগুলো যেভাবে সামলানো হচ্ছে, তার বেশ সমালোচনা করেন রমুলাস হুইটেকার। বিশেষ করে কেরালার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কেরালা ভারতের এমন একটি বিরল রাজ্য যেখানে ফসলের ক্ষতি করা বুনো শূকর মারার আইনি অনুমতি রয়েছে। তবে সেগুলোকে আবার মাটিতে পুঁতে ফেলার বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। পরিবেশবিদ মাধব গ্যাডগিলের সুরে সুর মিলিয়ে হুইটেকার এই নীতিকে অযৌক্তিক বলে মনে করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, প্রোটিনের একটি বড় উৎস কেন এভাবে নষ্ট করা হবে? তিনি বলেন, একটি বুনো শূকর ধান বা চীনাবাদামের খেতের যতটা ক্ষতি করতে পারে, তা কোনো অংশে একটি হাতির চেয়ে কম নয়। কিন্তু মারার পর সেই মাংস পুঁতে ফেলতে বলা হচ্ছে। অথচ বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় মানুষের প্রোটিনের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। উত্তর ভারতের কিছু জায়গায় দেখা বৈদ্যুতিক বেড়ার কথা স্মরণ করে তিনি জানান, সেখানে নীলগাই, শেয়াল বা ময়ূর নির্বিচারে প্রাণ হারাচ্ছে এবং সেগুলো পচে নষ্ট হচ্ছে। তার মতে, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার চেয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক প্রতিরোধমূলক অবকাঠামো অনেক বেশি কার্যকর।

ইন্দিরা গান্ধীকে ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে বন্যপ্রাণীবান্ধব প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গণ্য করেন হুইটেকার। ১৯৭২ সালের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনের মতো গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়নে ইন্দিরার বড় ভূমিকা ছিল। হুইটেকার স্মৃতিচারণা করে বলেন, “১৯৭২ সালে তিনি মাদ্রাজ স্নেক পার্কে এসেছিলেন, তখন আমরা বন্যপ্রাণী নিয়ে নানা সমস্যার কথা তাকে জানাই। পরবর্তীতে রাজীব গান্ধী যখন প্রধানমন্ত্রী হলেন, আমরা তার কাছে আন্দামানের বন উজাড়ের বিষয়টি তুলে ধরি এবং তিনি তা বন্ধের নির্দেশ দেন। সেই সময়ে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলা যেত এবং পরদিন তার প্রতিফলন দেখা যেত; আজকের দিনেও যদি এমনটা হতো!”

পদ্মশ্রী পুরস্কার পাওয়ার পর নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎ হয়েছিল রমুলাস হুইটেকারের, তবে বিস্তারিত কথা বলার সুযোগ পাননি তিনি। পরবর্তীতে তিনি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে একটি বার্তার খসড়া পাঠান। তার আশা ছিল, জনপ্রিয় রেডিও অনুষ্ঠান ‘মন কি বাত’-এ প্রধানমন্ত্রী যদি সাপে কাটার প্রতিরোধ নিয়ে কিছু বলেন। হুইটেকার বলেন, প্রধানমন্ত্রী যদি সাপে কাটাকে একটি জরুরি চিকিৎসা সংকট হিসেবে উল্লেখ করে মাত্র এক মিনিট কথা বলেন এবং সরকারি হাসপাতালগুলোতে এর চিকিৎসা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন, তবে হাজার হাজার প্রাণ বাঁচানো সম্ভব।

হুইটেকার যখন প্রথম ভারতের সাপেদের নিয়ে কাজ শুরু করেন, তখন দেশটিতে মাত্র ২৭৫টি প্রজাতির সন্ধান জানা ছিল। আজ সেই সংখ্যা ৩৬০ ছাড়িয়েছে। সরীসৃপবিদ্যা বা ‘হারপেটোলজি’ নিয়ে যারা কাজ করতে চায়, সেই তরুণ প্রজন্মের জন্য এখন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অভূতপূর্ব সুযোগ দেখছেন তিনি। নতুনদের উদ্দেশ্যে তার পরামর্শ, সেসব প্রতিষ্ঠানে যাও, স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করো এবং শেখো। প্রকৃতিকে পর্যবেক্ষণ করো, তাকে সম্মান করতে শেখো; হিরো সাজার চেষ্টা কোরো না। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ মানে ধৈর্য আর সহমর্মিতা, লোকদেখানো কোনো প্রদর্শনী নয়।”

আশির কোঠায় পা রাখা হুইটেকার আজও চলচ্চিত্র নির্মাণ আর সচেতনতামূলক প্রচারণার মাধ্যমে সাপে কাটা রোধে কাজ করে যাচ্ছেন। শৈশবে সাপের প্রাণ বাঁচাতে ঢাল হয়ে দাঁড়ানো সেই কিশোর আজ এক পরিণত মানুষ, যিনি একটি দেশের মানুষের মন থেকে সাপের ভয় দূর করে তাদের বিজ্ঞানমনস্ক হতে শিখিয়েছেন। তার জীবনগল্প আমাদের শেখায়—প্রকৃতিকে চেনা এবং ভয়কে জয় করে বিজ্ঞানের আলোয় পথ চলাই হলো আসল সার্থকতা।

টাইমস অব ইন্ডিয়া

Facebook Comments Box
এই ক্যাটাগরির আরও খবর
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৪ কৃষি সংবাদ
Theme Customized By Shakil IT Park