সুমন ইসলাম:
বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে কৃষি খাতের গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রয়েছে। মোট দেশজ জাতীয় উৎপাদনে এই খাতের অবদান প্রায় ১৪ শতাংশ। কৃষি খাতেই সবচেয়ে বেশী কর্মসংস্থান যা মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪৫ শতাংশ এবং কর্মজীবী নারীর প্রায় ৬০ শতাংশ এই কৃষি খাতে নিয়োজিত। দেশের কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা কৃষি শ্রমিকদের অবদানের যথাযথ স্বীকৃতি না দিয়ে তাদেরকে দারিদ্রতার মধ্যে, চরম অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে নিম্নমানের জীবনযাপনে বাধ্য করা হচ্ছে। কৃষি শ্রমিকরা শ্রম আইনের আওতাভূক্ত নয় বলে তারা শ্রম আইনের সুরক্ষা পায়না, ফলে আইনি স্বীকৃত অধিকার হতে তারা বঞ্চিত।
সস্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি ফার্ম শ্রমিক ফেডারেশনের পক্ষ থেকে আয়োজিত অনুষ্ঠানে শ্রম সংস্কার কমিশনের কমিশন প্রধান সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ শ্রমিকদের উদ্দেশ্য করে বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেছেন তার মূল অংশটুকু পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-
কমিশন প্রধান সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, সরকারি খামারের শ্রমিকরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। সরকারি খামারে প্রদীদের নিচে অন্দকার। তাদের শ্রমিকদের মধ্যে অর্ন্তভুক্ত করতে হবে। এই সেক্টরের বৈষম্য দুর্নীতি ও প্রবঞ্চনা থেকে শ্রমিকদের রক্ষার জন্য সবাইকে ঐক্যবন্ধ থাকারও আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, শ্রমিকদের বৈষম্য ও প্রবঞ্চনার চিত্র কুৎসিত। যা আমরা বাইরে থেকে বুঝতে পারি না, বোঝার সুযোগও কম। বর্তমান সময়ে আউট সোসিং কোম্পানিগুলো চাকরি দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিলেও শ্রমিকদের বঞ্চিত করছে। এগুলো আমাদের অনেকের জানা, কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের অবস্থা আরো কঠিন। তারা বিভিন্নভাবে বঞ্চনা ও প্রতাড়নার শিকার হচ্ছেন। মালিকরা মনে করেন চাকরি দিয়ে তারা করুণা বা দয়া করছে। তারা মনে করেন ১০ বছর বেতন দিয়েছেন, এক বা দুই মাস না দিলে সমস্যা নাই। কিন্তু মালিকরাও জানেন শ্রমিকরা অগ্রিম শ্রম দিয়ে তারপরেই বেতন-ভাতাদি দাবি করেন। এমন কোনো মালিক নাই যারা শ্রমিকদের অগ্রিম বেতন দেন বা দিয়ে কাজ করান। এসব ক্ষেত্রে শ্রমিকদের বৈষম্য দূর করা বা অবসান করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, কর্মচারী ও শ্রমিকদের মধ্যে চরম বৈষম্য বিরাজ করছে। এই সকল বৈষম্য একত্রিত হলে যে কুৎসিত অবস্থা তৈরি হবে তা সমাজ ধারণ করতে পারবে না। শ্রমিকদের আলাদা করে রাখা হয়েছে, কেউ দৈনিক, কেউ মাসিক, কোউ আউট সোাসিং, কেউ বা চুক্তি ভিত্তিক। এগুলো সব একত্রিত করতে হবে। আমাদের দেশে শ্রমিকদের অনেক সংগঠন থাকলেও ৯০ এর দশকের মতো নয়। তখনকার সময়ে যে শক্তিটা দেখা যেত এখন সেটা আর দেখা যায় না। এই সকল শ্রমিকদের শক্তি একত্রিত করতে হবে।
তিনি মনে করেন, সকল শ্রমিকদের একত্রিত করে তা শক্তিতে রুপান্তরিত করতে হবে। কষ্ট ও শক্তি একত্রিত করতে না পারলে আমরা বিচ্ছিন্নই থাকবো। এটা চলতে পারে না।
প্রধান সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, শ্রমিক সংস্কার কমিশন শুধুমাত্র শ্রমিকদের কল্যাণের জন্য প্রয়োজনীয় সুপারিশগুলো সরকারের কাছে তুলে ধরবে। যা বাস্তবায়ন করবে সরকার। তবে সুপারিশগুলো কতোটা বাস্তবায়ন বা পূরণ হবে তা নির্ভর করছে শ্রমিকদের তৎপড়তার ওপর। সরকার যে শ্রমিকদের দাবি বা প্রত্যাশাপূরণ করবে সেটা ভাবার অবকাশ নোই। যদি না আমরা দাবি আদায়ে তৎপড়তা বা কতোটা চাপ দিতে পারি। এই চাপ অব্যাহত রাখতে পারি।
তিনি আহত শ্রমিকদের চিকিৎসার বিষয়ে বলেন, আমরা কতোটা চিকিৎসা সেবা পাবো এ জন্য হাসপাতাল কেনো চিহ্নিত করে রাখা থাকবে। এজন্য আইন ও নীতিমালা সংশোধনের প্রয়োজন রয়েছে। সংশোধন করে লিখতে হবে চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে হবে। আমরা দ্রুত এ্যাকশনের জন্য সরকারের কাছে সুপারিশ দেব। সকল শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসুচির মধ্যে আনতে হবে। এজন্য একটি ডাটা বেইজ করে প্রযোজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলেন শ্রম সংস্কার কমিশন প্রধান।
উল্লেখ্য, কৃষি শ্রমিক হলো যারা কৃষির বিভিন্ন শাখা যেমন, কৃষিজাত পণ্য উৎপাদন করতে শষ্য ক্ষেতে, বাগানে, বীজাগারে, গবাদি পশু প্রতিপালন, দুগ্ধ খামার, মৎস চাষ এবং প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজে শ্রম দান করে থাকে। তারা ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের খামার হতে শুরু করে বৃহৎ শিল্পায়িত সবধরনের খামার ও বনায়নে নিয়োজিত। তারা মজুরি ভিত্তিক শ্রমিক, কারণ যে খামার বা জমিতে তারা কাজ করে অথবা যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম ব্যবহার করে, সেগুলো তাদের নিজস্ব নয় এবং এরা মূলত (অধিকাংশই প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক বিহীন) মজুরির বিনিময় কৃষি কাজে নিযুক্ত থাকেন। এই জাতীয় শ্রমিকের মধ্যে রয়েছে: স্থায়ী কৃষি শ্রমিক; অস্থায়ী কৃষি শ্রমিক। মৌসুমী/নৈমিত্তিক কৃষি শ্রমিক; অভিবাসী (মাইগ্রেন্ট) কৃষি শ্রমিক, খণ্ডকালীন শ্রমিক। অথবা কোন কিছুর বিনিময়ে কাজ করা শ্রমিক।