কৃষি সংবাদ প্রতিবেদক:
দেশের ৫৬শতাংশ ক্ষুদ্র জেলে সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত থাকেন এবং ৮৩ শতাংশ নিষেধাজ্ঞার শেষে ১-২ মাস পরে গিয়ে সহায়তা পান। এছাড়া ৮৭শতাংশ জেলে কোনো আয় ভিত্তিক কার্যক্রম বা দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় নেই, ৭০শতাংশ অনানুষ্ঠানিক উচ্চসুদ ঋণের কারণে ফাঁদে পড়ে টিকে থাকার জন্য অবৈধভাবে মাছ ধরতে বাধ্য হন। এ কারণে শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, ক্ষুদ্র জেলেদের ন্যায্য সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সমাজের নাগরিকরা।
সোমবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে কোস্ট ফাউন্ডেশন আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানোনো হয়েছে।
বক্তারা তাদের বক্তব্যে ইলিশ আহরণের পরিমাণ হ্রাস পাওয়া, সহায়তা বিতরণে দেরি হওয়া, বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বিকল্প আয়ের অভাব, জীববৈচিত্র্যের অবক্ষয়, ইকোট্যুরিজমের নামে জেলে পল্লীর জায়গা বেদখল এবং অনানুষ্ঠানিক ঋণের ফাঁদে পড়ে ক্ষুদ্রজেলে পরিবারের গভীর সামাজিক-অর্থনৈতিক সংকটে মধ্যেপড়ার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তারা সরকারের প্রতি আহবান জানান যেন ক্ষুদ্র জেলেদের জন্য, বিশেষ করে নারী ও যুবকদের, সময়মতো সহায়তা প্রদান ও আয়ের বিকল্প কার্যক্রম সম্প্রসারণের পাশাপাশি স্বচ্ছ উপায়ে নির্বাচিত উপকারভোগীদের মাঝে সহায়তা বণ্টন নিশ্চিত করা হয়।
কোস্ট ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক এম রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, দেশের প্রায় ২৫ লক্ষ মানুষ মাছ ধরা, বাজারজাতকরণ, বিপনণ, ইত্যাদির সাথে সরাসরি জড়িত। এর মধ্যে প্রায় ৪ লক্ষ ৫০ হাজার জেলে সরাসরি ইলিশ মাছ ধরার সাথে জড়িত। আমরা এটা বিশ্বাস করি, ইলিশের পুনরুৎপাদনের জন্য মৎস্য আহরণে নিষেধাজ্ঞা অত্যন্ত জরুরি, তবে এই নিষেধাজ্ঞা যেন ক্ষুধা বা অভুক্ত থাকার কারণেপরিণত না হয়। সরকারকে অবশ্যই নিষেধাজ্ঞা শুরু হওয়ার আগেই প্রতিটি নিবন্ধিত জেলে পরিবারকে ৪০ কেজি চাল ও ৮ হাজার টাকা প্রদান করতে হবে এবং অন্তত একজন সদস্যের জন্য বিকল্পআয় ভিত্তিক কাজের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। তিনি আরও বলেন, যুব মৎস্যজীবীদের জন্য পেশাগত প্রশিক্ষণ ও বিকল্প জীবিকার সুযোগ তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি ছোট নৌকায় (খাল ও নদীতে) বসবাসকারী মান্দা সম্প্রদায়কে জেলে কার্ড প্রদান ও নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে রাখার আহবান জানান।
মূল প্রবন্ধে কোস্ট ফাউন্ডেশনের উপ-নির্বাহী পরিচালক সনত কুমার ভৌমিক, বলেন, দেশের ৫৬শতাংশ ক্ষুদ্র জেলে সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত থাকেন এবং ৮৩ শতাংশ নিষেধাজ্ঞার শেষে ১-২ মাস পরে গিয়ে সহায়তা পান। এছাড়া ৮৭শতাংশ জেলে কোনো আয় ভিত্তিক কার্যক্রম বা দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় নেই, এবং ৭০শতাংশ অনানুষ্ঠানিক উচ্চসুদ ঋণের কারণে ফাঁদে পড়ে টিকে থাকার জন্য অবৈধভাবে মাছ ধরতে বাধ্য হন। আর্থিক চাপের কারণে নিষেধাজ্ঞা চলাকালে জেলে পরিবারে পারিবারিক সহিংসতা ৩০-৪০শতাংশ বৃদ্ধিপায়।তিনি বেআইনি জালের ব্যবহার বন্ধ ও জাল উৎপাদনকারী কারখানাগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণেরও আহবান জানান।
কোস্ট ফাউন্ডেশনের পরিচালক-প্রশাসন মোস্তফা কামাল আকন্দ বলেন, জাতীয় পর্যায়ে প্রকৃত জেলেদের নিয়ে ডাটা বেইস দ্রুত হালনাগাদ করা, তাদের জন্য সহজশর্তে ঋণ ও অনুদান সুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে নিষেধাজ্ঞাকালীন সময়ে জেলেপরিবারগুলো ভালো থাকতে পারে।
ত্রিণমূল উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক খন্দকার ফারুক আহমেদ বলেন, সংরক্ষণের পাশাপাশি খাদ্যনিরাপত্তা ও জীবিকার সুরক্ষা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করতে হবে। ক্ষুদ্র মৎস্যজীবীদের ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠাই টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত।
কোস্ট ফাউন্ডেশনের ক্লাইমেটচেইঞ্জ এন্ড রেসিলিয়েন্সের প্রধান আবুল হাসান বলেন, ক্ষুদ্র জেলে এবং কৃষকরাই জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মুখসারির সংগ্রামী জনগোষ্ঠী। ইলিশ আহরণের হ্রাসের সঙ্গে ধ্বংসাত্মক মাছ ধরা, অপরিকল্পিত খনন, এবং উপকূলীয় অভয়ারণ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সম্পর্ক রয়েছে। বিকল্প জীবিকার জন্য পৃথক উন্নয়ন তহবিল গঠনের দাবি এখন সময়ের দাবি।