কৃষি সংবাদ ডেস্ক:
বাংলাদেশে থাই পাঙাশের দাপটে কৃত্রিম প্রজননে খুব একটা সফলতা আসেনি দেশি পাঙাশে।এখন দেশের প্রাণিজ আমিষের অন্যতম উৎসে পরিণত হয়েছে। এই মাছ অনেকে আবার এ মাছের আচারও তৈরি করছে। কিন্তু এই জায়গা দখলে নিতে পারত দেশের নদ-নদীতে পাওয়া সুস্বাদু দেশি প্রজাতির পাঙাশ।
কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে দেশি পাঙাশকে সাধারণের জন্য সহজলভ্য করার সম্ভাবনা তৈরি করেছিলেন তরুণ মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ খলিলুর রহমান। ১৯৮৮ সালে মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের চাঁদপুরের নদী কেন্দ্রে যোগ দেন তিনি। যোগদানের বছরই দেশি পাঙাশের কৃত্রিম প্রজনন ঘটিয়ে পোনা উৎপাদন ও চাষাবাদ কৌশল প্রণয়নের দায়িত্ব পড়ে তার ওপর।
অন্যদিকে, ১৯৯০ সালে থাইল্যান্ড থেকে আনা পাঙাশের পোনার কৃত্রিম প্রজননের দায়িত্বও খলিলুর রহমানকে দেওয়া হয়। তিন বছরের মধ্যে সে কাজে সফল হন তিনি। এই সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি রাষ্ট্রীয় পদক পান।
খলিলুর রহমান ২০২২ সালে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) মহাপরিচালক হিসেবে অবসর নেন। সম্প্রতি বলেন, ‘১৯৮৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আমি বিএফআরআইয়ে যোগ দিই। যোগদান করেই দেশি পাঙাশের কৃত্রিম প্রজননের দায়িত্ব পাই। তখন একটা চ্যালেঞ্জ ছিল জীবিত পাঙাশ মাছ ধরা। মেঘনায় ধরা পড়া পাঙাশ ঘাটে আনতে আনতে মরে যেত।’
দীর্ঘ ১৬ বছরের পরিশ্রমে ২০০৪ সালের জুনে দেশি পাঙাশের প্রজনন ঘটিয়ে পোনা উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছিলেন খলিলুর রহমান। কিন্তু চার মাসের মাথায় এই পোনা পুকুর থেকে ‘রহস্যজনকভাবে’ চুরি হয়ে যায়। এরপর এই উদ্যোগ আর সফল হয়নি। এ জন্য কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও গবেষণার ধারাবাহিকতা রক্ষা না করাকে দায়ী করেন খলিলুর রহমান।
তখন আড়তদাররা নদীর পাঙাশ কেজিপ্রতি ১০০ টাকায় বিক্রি করতেন বলে উল্লেখ করেন খলিলুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমি তখন আড়তদারদের বললাম, প্রতি কেজি জীবিত পাঙাশ ৩০০ টাকায় নেব। কিন্তু তা ৫ থেকে ১০ কেজি ওজনের পুরুষ ও স্ত্রী পাঙাশ হতে হবে। কিন্তু দেখা গেল, জীবিত মাছ যেগুলো আসছিল, তার সব কটি আধা মরা ও আহত। সেগুলো দিয়ে তো আর কৃত্রিম প্রজনন সম্ভব না।’
খলিলুর রহমান নিজেই ইনস্টিটিউটের অধীন থাকা স্পিডবোট নিয়ে মেঘনায় চলে যান। সঙ্গে নেন একজন ফিল্ড অ্যাসিস্ট্যান্ট ও দুজন জেলেকে। তখন মেঘনা নদীর লক্ষ্মীপুর অংশের হিজলায় জোয়ারের সময় পাঙাশের ঝাঁক ধরা পড়ত।
দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে জেলেদের অবস্থান শনাক্ত করে তাঁদের কাছে চলে যেতেন বলে জানান খলিলুর রহমান। তিনি বলেন, ‘আমরা জেলেদের কাছে গিয়ে তাঁদের কাছ থেকে সরাসরি ৫ থেকে ১০ কেজি ওজনের পাঙাশ মাছ সংগ্রহ করতাম।’
এভাবে ৬ দিনে ২০০ পাঙাশ মাছ সংগ্রহ করে ফেলেন খলিলুর রহমান। তিনি বলেন, ‘এগুলোকে ট্রিটমেন্ট দিয়ে পুকুরে সংরক্ষণ করি। সঠিক পুষ্টিসম্পন্ন খাবার নিশ্চিত করি। দেশি পাঙাশের বৃদ্ধি ছিল ধীরগতির। দীর্ঘ ১৬ বছর পর ২০০৪ সালের ৩০ জুন কৃত্রিম প্রজননে সফল হই। এর চার মাস পর একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি, পুকুর থেকে সব পাঙাশ চুরি হয়ে গেছে। এটা নিয়ে ঊর্ধ্বতনদের চিঠি লিখি। তদন্ত কমিটি হলেও দোষী ব্যক্তিরা শনাক্ত হননি।’
১৯৯০ সালে থাইল্যান্ড থেকে আনা পাঙাশের পোনার কৃত্রিম প্রজননের দায়িত্বও খলিলুর রহমানকে দেওয়া হয়। তিন বছরের মধ্যে সে কাজে সফল হন তিনি। এই সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি রাষ্ট্রীয় পদক পান।
বছরখানেক পর খলিলুর রহমানকে চাঁদপুর থেকে যশোরে বদলি করা হয়। যশোরেও তিনি দেশি পাঙাশের কৃত্রিম প্রজননের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এই তথ্য জানিয়ে খলিলুর রহমান বলেন, প্রয়োজনীয় সহযোগিতার অভাবে সেটা সফল হয়নি।
পরে খলিলুর রহমানকে ময়মনসিংহে বদলি করা হয়। সেখানে আরও একবার তিনি দেশি পাঙাশের কৃত্রিম প্রজননের চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় তহবিল ও সহযোগিতার অভাবে তা আর হয়ে ওঠেনি বলে জানান তিনি।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) তৎকালীন মহাপরিচালক এম এ মজিদ বলেন, মেঘনা নদী থেকে পাঙাশ আহরণ করে আমরা দুই দফায় চেষ্টা করেছিলাম কৃত্রিম প্রজনন ঘটানোর। একবার পুকুরে, আরেকবার ডাকাতিয়া নদীতে। কিন্তু থাই পাঙাশের সফলতার কারণে পরে আর দেশি পাঙাশের কৃত্রিম প্রজনন এগোয়নি।
দেশি পাঙাশের কৃত্রিম প্রজনন সফল হওয়ার পর পুকুর থেকে পোনা চুরি হয়ে যাওয়ার ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে এম এ মজিদ বলেন, ‘চাঁদপুর নদী কেন্দ্র থেকে একটা চিঠি আমাকে পাঠানো হয়েছিল। পুকুর থেকে প্রায় ২৫০টি দেশি পাঙাশের পোনা চুরি হয়ে গেছে, জাল ফেলে একটা পোনাও পাওয়া যায়নি, এ রকম একটা চিঠি। ঘটনাটি তদন্ত করেছিলেন কি না, জানতে চাইলে এম এ মজিদ বলেন, এ বিষয়ে কিছু বলার নেই।
খলিলুর রহমান মনে করেন, কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও গবেষণার ধারাবাহিকতা রক্ষা না করায় দেশি পাঙাশের কৃত্রিম প্রজননের উদ্যোগের কোনো অগ্রগতি হয়নি।
১৯৯০ সালের ২৭ আগস্ট বাংলাদেশে থাই পাঙাশের পোনা নিয়ে আসেন তৎকালীন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা সেলের যুগ্ম প্রধান লোকমান আহমদ, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা গৌতম বড়ুয়া ও জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সানাউল্লাহ।
সেই পোনা থেকে কৃত্রিম প্রজনন ঘটানোর দায়িত্ব পড়ে খলিলুর রহমানের ওপর। তিনি একই সময়ে দেশি পাঙাশের কৃত্রিম প্রজনন নিয়ে গবেষণা করছিলেন।
খলিলুর রহমান বলেন, ‘থাইল্যান্ড থেকে আনা পাঙাশের ৫০০ পোনা আমাকে দেওয়া হয়েছিল কৃত্রিম প্রজনন ঘটাতে। এক ইঞ্চির কিছুটা কম দৈর্ঘ্যের এসব পোনা চাঁদপুর নদী কেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে পুকুরে প্রতিপালন শুরু করি।’
১৯৯৩ সালের ৮ মে খলিলুর রহমান থাই পাঙাশের কৃত্রিম প্রজননে সফল হন। একই সঙ্গে এই মাছের চাষাবাদ কৌশলও প্রণয়ন করেন তিনি।
খলিলুর রহমান বলেন, ‘যশোর, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ ও বগুড়ায় মৎস্যচাষিদের থাই পাঙাশ চাষের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিই। মূলত এরপরই সারা দেশে থাই পাঙাশের চাষ বাড়তে থাকে।’
দেশি পাঙাশের কৃত্রিম প্রজনন ঘটাতে খলিলুর রহমানের লেগেছিল ১৬ বছর। কিন্তু থাই পাঙাশের কৃত্রিম প্রজনন মাত্র তিন বছরেই ঘটানো সম্ভব হয়। এই সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯৩ সালে তিনি রাষ্ট্রীয় পদক পান।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) সাবেক পরিচালক মো. আনিসুর রহমান বলেন, আমরা সব সময়ই চেষ্টা করি, কৃত্রিম প্রজননের ক্ষেত্রে দেশি প্রজাতিকে প্রাধান্য দিতে। কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পাঙাশের দেশি প্রজাতির বিস্তার ঘটাতে পারলে তা আমাদের জন্য ভালো হতো।
আনিসুর রহমান বলেন, দেশি প্রজাতির পাঙাশের কৃত্রিম প্রজননে খলিলুর রহমান একটা বাধার মুখে পড়েছিলেন বলে শুনেছিলাম। উদ্যোগটি সফল হলে সামগ্রিকভাবে দেশের মৎস্য খাতের জন্য ইতিবাচক হতো।
সূত্র: প্রথম আলো