কৃষি সংবাদ ডেস্ক:
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের আওতায় কৃত্রিম প্রজনন ও ঘাস উৎপাদন শাখায় ২০২০-২১ অর্থবছরে ১৫ লাখ লিটার তরল নাইট্রোজেন কেনার চুক্তি হয়েছিল। চুক্তি অনুযায়ী, প্রথম লটে কেনা হয় ১২ লাখ লিটার তরল নাইট্রোজেন। এরই মধ্যে সেখান থেকে ৪ লাখ লিটার নাইট্রোজেন উবে গেছে বলে উঠে এসেছে কমপ্লায়েন্স অডিট রিপোর্টে।
তবে পশুচিকিৎসক ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে টাকা লোপাট করে অতিরিক্ত হারে নাইট্রোজেন বাষ্পায়িত দেখানো হয়েছে, যা বিশ্বের কোনো দেশে রেকর্ড নেই।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, প্যাকেজ (জিআর ও লট-১) আওতায় দরপত্রের মাধ্যমে মেসার্স লিন্ডে বাংলাদেশ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে থেকে ২০২০-২১ অর্থবছরে ১৫ লাখ লিটার তরল নাইট্রোজেন কেনার চুক্তি সম্পাদন হয়।
চুক্তি মোতাবেক ১২ লাখ ১৩ হাজার ৭১৭ লিটার তরল নাইট্রোজেন সরবরাহ করে সরবরাহক প্রতিষ্ঠান লিন্ডে বাংলাদেশ। এরপর এসব তরল নাইট্রোজেন ৫০ লিটার ১৩ লিটার ও ২ লিটার ক্যানে সারা দেশের ২২টি কেন্দ্রে সরবরাহ করা হয়। অনুমোদিত কোনো অপচয় বা বাষ্পায়িত হার না থাকা সত্ত্বেও ১২ লাখ ১৩ হাজার ৭১৭ লিটার তরল নাইট্রোজেনের বিপরীতে ৪ লাখ ১০ হাজার ৯৬৯ লিটার তরল নাইট্রোজেন উবে বা বাষ্পায়িত দেখানো হয়েছে, যা হিসাব কষলে ৩৩.৮৬ শতাংশ হারে বাষ্পায়িত দেখানো হয়।
প্রতি লিটার তরল নাইট্রোজেনের তৎকালীন মূল্য ছিল ২৪ টাকা। সেই হিসেবে তরল নাইট্রোজেন ব্যবহার ও পরিবহনে অতিরিক্ত বাষ্পায়িত দেখানোর ফলে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৫৪ লাখ ৯৩ হাজার ৮৬৪ টাকা।
প্রাণিসম্পদের ভেটেরিনারি সার্জন (ভিএস) ও মাঠপর্যায়ের এআই টেকনিশিয়ানদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশে সিমেন (ফ্রোজেন ভ্রূণ) দীর্ঘদিন সংরক্ষণের জন্য দরকার হয় অতি নিম্ন তাপমাত্রা। তরল নাইট্রোজেনের তাপমাত্রা মাইনাস ১৯৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তাই তরল নাইট্রোজেনে সিমেন ভিজিয়ে রাখলে বছরের পর বছর তা সংরক্ষিত থাকে। প্রজনন কাজের সুবিধার্থে বছরে লাখ লাখ লিটার তরল নাইট্রোজেন কেনে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর।
এআই টেকনিশিয়ানরা বলছেন, এ তরল নাইট্রোজেন সাধারণ পাত্রে রাখলে খুব দ্রুত উড়ে যায়। তাই দরকার এমন এক ভ্যাকুয়াম ফ্লাস্ক যার মুখটা খুব ছোট আর শরীরটা খুব ভালোভাবে তাপের অপরিবাহী। এটিই সাধারণত নাইট্রোজেন ক্যান নামে পরিচিত। নাইট্রোজেন ক্যান থেকেও নাইট্রোজেন উড়ে যায়। তবে সাইজ অনুযায়ী কয়েকদিন থেকে কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস লাগে। আর নাইট্রোজেন কমে গেলে রিফিল করে নিতে হয়। সাইজ বা লিটার অনুযায়ী নাইট্রোজেন ক্যান ১ থেকে ৮০ লিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। ছোট ক্যানে তাড়াতাড়ি নাইট্রোজেন শেষ হয়ে যায়, কিন্তু তা বহন করা সহজ। বড় ক্যানে অনেক দিন থাকে, কিন্তু বহনে অসুবিধা হয়। এআই কর্মীরা সাধারণত দুটি নাইট্রোজেন ক্যান ব্যবহার করেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ১০ থেকে ১৩ লিটারের ট্যাঙ্কে তারা তাদের সংগ্রহ বাসায় জমা রাখেন এবং ১ থেকে ২ লিটারের ট্যাঙ্ক মোটরসাইকেল বা হাতে নিয়ে ঘুরে বেড়ান।
আন্তর্জাতিক রিসার্স গ্যাজেটের তথ্য বলছে, তরল নাইট্রোজেনের আন্তর্জাতিক বাষ্পায়িত হওয়ার স্বীকৃত হার ৬.৬৭ শতাংশ। অস্ট্রেলিয়ায় তরল নাইট্রোজেনের বাষ্পায়িত হওয়ার হার ৬.৬৭ শতাংশ থেকে প্রায় ৮ শতাংশ। এদিকে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, বাংলাদেশের উষ্ণ আবহওয়ার কারণে তরল নাইট্রোজেনের বাষ্পায়িত হওয়ার সম্ভাব্য হার ১৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। প্রাণিসম্পদ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শীতপ্রধান বা মরু অঞ্চলের দেশের চেয়ে এশিয়ায় তাপমাত্রা বেশি হওয়ায় উদ্বায়ী পদার্থের বাষ্পায়িত হওয়ার হার অনেকটা বেশি হয়। তবে তা আন্তর্জাতিক বাষ্পায়িত হওয়ার হারের দ্বিগুণ কিংবা তিনগুণ হবে, সেটি ঠিক নয়। এখানে ১২ লাখ লিটারের ৪ লাখ লিটার উড়ে গেছে হিসাবে ৩৩ শতাংশ বাষ্পায়িত দেখানো হয়েছে, যা দ্বিগুণ কিংবা তিনগুণ ছাড়িয়ে পাঁচগুণ হয়েছে। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ১২ থেকে ১৪ শতাংশের বেশি তরল নাইট্রোজেন বাষ্পায়িত হয় না।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, বাংলাদেশের জন্য তরল নাইট্রোজেনের বাষ্পায়িত সম্ভাব্য হার ১৫ শতাংশ বিবেচনা করলে ১ লাখ ৮২ হাজার ৫৮ লিটার উড়ে যেতে পারে। কিন্তু বাষ্পায়িত দেখানো হয়েছে ৪ লাখ ১০ হাজার ৯৬৯ লিটার, যা ৩৩.৮৬ শতাংশ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বলেন, তরল নাইট্রোজেন বাতাসে উড়ে যায়, কিন্তু তিন ভাগের এক ভাগ উড়ে যায় কখনো শুনিনি। সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ উড়ে যেতে পারে। ১ লিটার তরল নাইট্রোজেন কিনলে স্থানান্তর কিংবা প্রজননের কাজে বারবার ক্যান খোলার কারণে ১০০ থেকে ১৫০ মিলি নাইট্রোজেন উড়ে যেতে পারে, কিন্তু ১ লিটারে ৪০০ মিলি উড়ে যায় এমনটা সম্ভব নয়। হয় নাইট্রোজেন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সাপ্লাই না দিয়ে বিল করেছে অথবা উড়ে গেছে দেখিয়ে বিল করে টাকা লোপাট করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলে প্রতিটি কাজ করা হয়েছে রাজনৈতিক বিবেচনায়। নিজেদের অনুগত ঠিকাদারদের দিয়ে কাজ করানোর কারণে জবাবদিহি ছিল না।
মাঠ পর্যায়ের অন্তত পাঁচজন এআই টেকনিশিয়ানের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নাইট্রোজেন বাষ্পায়িত হওয়ার পরিমাণ তারা সেভাবে হিসেব কষতে পারেননি। প্রাণিসম্পদ দপ্তর থেকে সাপ্লাই ক্যান সরবরাহ করার পর শুধু পরিমাণ উল্লেখ করা হয়। তবে সরবরাহের সময় কোনো ওজন দেওয়া হয় না। ফলে কী পরিমাণ উড়ে গেল, তা জানতেও পারেন না তারা। উড়ে যাওয়ার সম্ভাব্য পরিমাণ ১৫ শতাংশের বেশি হবে না বলেও জানান তারা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কৃত্রিম প্রজনন শাখার উপপরিচালক (পরিসংখ্যান) ড. মো. সফিকুর রহমান বলেন, শীতপ্রধান দেশে তরল নাইট্রোজেন উড়ে যাওয়ার হার অনেক কম। তরল নাইট্রোজেনের তাপমাত্রা মাইনাস ১৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তাই শূন্য ডিগ্রিতেও তরল নাইট্রোজেন উড়ে যায়। আমাদের দেশে কক্ষ তাপমাত্রায় এ উড়ে যাওয়ার হার ৩০ শতাংশের বেশিও হতে পারে।
সূত্র : প্রতিদিনের সংবাদ