কৃষি সংবাদ প্রতিবেদক:
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেছেন, মহিষ আমাদের সম্পদ। মহিষ পালনকারীরা আমাদের সম্পদ। মহিষের মাংসে কোলেস্টেরল কম, তাই মহিষের মাংসকে জনপ্রিয় করতে হবে। দেশের নানা স্থানে মহিষের দুধ থেকে তৈরি দইয়ের নানা বৈচিত্র্য দেখা যায়। মহিষের দইকে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের জন্য কাজ করতে হবে। মহিষ পালনকারী খামারিদের সকল প্রকার সহাযোগিতা প্রদানের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন মাঠ পর্যায় থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে, সংগৃহীত তথ্য নিয়ে গবেষণা করতে হবে।
উপদেষ্টা আজ বিকালে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) অডিটোরিয়ামে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই) কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন ‘মহিষ গবেষণা ও উন্নয়ন (প্রথম সংশোধিত)” শীর্ষক উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় এসব কথা বলেন।
প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা বলেন, ক্লাইমেট চেঞ্জ এখন বাস্তব। তাই ক্লাইমেট চেঞ্জের সাথে খাই খাইয়ে নিতে পারে এমন প্রাণী হিসেবে মহিষকে অনেক গুরুত্বের সাথে দেখতে হবে। মহিষ বৈষম্যের শিকার হওয়া একটি প্রাণী। তাই মহিষ পালনকে জনপ্রিয় করার লক্ষ্যে কমিউনিটি পর্যায়ে কাজ করতে হবে। অভিজ্ঞ মহিষ খামারিরা মহিষের হিটে আসা শনাক্ত করতে পারেন, মহিষ সংক্রান্ত নানাবিধ জ্ঞান ধারন করেন। তাদের জ্ঞানকে বিজ্ঞানের ভাষায় প্রকাশ করতে হবে। উন্নয়ন প্রকল্প শেষে গবেষণা কার্যক্রমগুলোকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তর করতে হবে। লক্ষ্য রাখতে হবে যেনো কোন গ্যাপ না থাকে।
উপদেষ্টা আরো বলেন, আমরা যদি খাদ্যে আমিষের যোগানের ক্ষেত্রে এমনকি দুধের দুধে ক্ষেত্রে বৈচিত্র আনতে চাই সেক্ষেত্রে আমরা পর্যাপ্ত সহায়তা পাইনা। দেশের গরু, ছাগল, মহিষ, হাস,মুরগীর যদি উন্নয়ন না করতে পারি তাহলে কিসের উন্নয়ন। আসলে উন্নয়নের ধারণার পরিবর্তন হওয়া উচিৎ। যারা মহিষ পালন করেন তাদের প্রতি যদি কোন সহায়তা না করতে না পারি তাহলে কিসের উন্নয়ন।
কর্মশালায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ এর উপাচার্য প্রফেসর ড. এ কে ফজলুল হক ভূঁইয়া, বিএআরসি এর নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. নাজমুন নাহার করিম এবং প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. আবু সুফিয়ান। উক্ত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. শাকিলা ফারুক।
অতিথিদের উদ্দেশ্যে স্বাগত বক্তব্য রাখেন ইনস্টিটিউটের অতিরিক্ত পরিচালক ড. এ বি এম মুস্তানুর রহমান। এরপর মহিষ গবেষণা ও উন্নয়ন প্রকল্পের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, অগ্রগতি ও অর্জন তুলে ধরেন উক্ত প্রকল্পটির প্রকল্প পরিচালক ও বিএলআরআই এর প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. গৌতম কুমার দেব।
ড. গৌতম কুমার দেব তার উপস্থাপনায় বলেন, বর্তমানে দেশের ৭টি বিভাগের ১২টি জেলায় প্রকল্পে কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রকল্পের মোট প্রাক্কলিত ব্যয়ের ৫৫.০৭% অর্থ বরাদ্দ পাওয়া গেছে এবং এর মধ্যে ৫১.৬৪% অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। এই অর্থ ব্যয়ের মাধ্যমে বিএলআরআই এর প্রধান কার্যালয়ে মহিষ কোয়ারেন্টাইন শেড; প্রধান কার্যালয় এবং রাজশাহী আঞ্চলিক কেন্দ্রে গাভী, প্রজনন ষাঁড়, গ্রোয়িং মহিষ ও বাছুরের শেড; রাজশাহী আঞ্চলিক কেন্দ্রের অফিস কাম ল্যাব ভবনের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ; প্রধান কার্যালয়ে আরসিসি রোড, ইত্যাদি পূর্ত কাজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যেই ৬৫টি দেশি জাতের মহিষসহ গবেষণা ও খামারের বিভিন্ন সরঞ্জামাদি ক্রয় করা হয়েছে।
খামারি পর্যায়ে গবেষণা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ইতোমধ্যেই ১১০০ জন খামারিকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে, ৮৬৮৭টি মহিষ নির্বাচন করা হয়েছে, ১৯৫৪১ ডোজ কৃমিনাশক ও ২৮০৬৬ ডোজ টিকা প্রদান করা হয়েছে। এছাড়াও, মহিষের রোগ-ব্যধি ও আন্তঃপ্রজনন বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, দেশি ফডারের চাষ ও উচ্চ ফলনশীল ফডার চাষ ডেমোনেস্ট্রেশন, মহিষের ইস্ট্রাস-সিনক্রোনাইজেশন ও কৃত্রিম প্রজননন প্রযুক্তি ব্যবহার; গাভী মহিষের রেশন ফরমুলেশন, মহিষ হৃষ্টপুষ্টকরণ প্রযুক্তি, খামারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, মহিষের ক্ষুরা রোগ ও গলাফোলা রোগের চিকিৎসা পদ্ধতি উন্নয়ন ইত্যাদি কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, গবেষণা কার্যক্রমের ফলাফল হিসেবে বেশ কিছু প্রযুক্তি উদ্ভাবনের লক্ষ্যে কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় উদ্ভাবনের অপেক্ষায় থাকা সম্ভাব্য প্রযুক্তিসমূহ হলো- মহিষ পালনে ফডারভিত্তিক স্বল্প খরচে খাদ্য ব্যবস্থাপনা; ২৪-২৬ মাস বয়সে বকনা মহিষের হিটে আসা; বাছুর মহিষ ব্যবস্থাপনা; মার্কার এসিস্টেড বুল সিলেকশন; মহিষের ইস্ট্রাস-সিনক্রোনাইজেশন প্রযুক্তি; মহিষের গলাফোলা রোগ নির্ণয়ের ডিভাইস উন্নয়ন; মহিষ খামারের বর্জ্য রিসাইক্লিং এবং দুগ্ধ পণ্যের ভ্যালুএডিশন (পনির, রসমালাই ও দই)। এসব প্রযুক্তির বেশির ভাগই বর্তমানে মাঠ পর্যায়ে ভেলিডেশনের কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। অবশিষ্ট প্রযুক্তিগুলোর ভেলিডেশন কার্যক্রমও অতিসত্বর শুরু করা হবে।