কৃষি সংবাদ প্রতিবেদক:
বেশ কয়েকদিনের টানা ভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি জেলা আবারও ভয়াবহ বন্যার মুখে পড়েছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ফেনী, বান্দরবান, মৌলভীবাজারসহ কয়েকটি জেলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানি কিছুটা কমে আসায় ক্ষয় ক্ষতির পরিমান ও ভোসা উঠেছে। ইতোমথ্যে দেশে চলমান বন্যায় এখন পর্যন্ত মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের ক্ষয় ক্ষতির পরিমাণ নিশ্চিত করেছে মৎস্য ও প্রাণি সম্পদ অধিদপ্তর ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রনালয় সূত্রে এ তথ্য জানাগেছে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের প্রতিবেদন দুটি পর্যারোচনা করে দেখাগেছে, এতে মোট ক্ষয় ক্ষতি হয়েছে ৩৯৯.১২ কোটি টাকার।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেছেন, বন্যাকবলিত এলাকার কৃষকদের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে জরুরি ভিত্তিতে বিশেষ বীজতলা তৈরি, ধানের চারা বিতরণ, গবাদিপশুর শুকনা খাদ্য সরবরাহ এবং খুরা রোগের টিকা দেয়া হবে।
গবাদিপশুর খাদ্য সংকট প্রসঙ্গে কৃষিমন্ত্রী বলেন, বন্যায় খড় ও ঘাস নষ্ট হয়ে যাওয়ায় গরু-ছাগলের খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। তাই দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় শুকনা গোখাদ্য, খড় ও ভুষি সরবরাহ করা হবে।
তিনি জানান, বর্ষা মৌসুমে গবাদিপশুর খুরা রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এজন্য আগামী দুয়েকদিনের মধ্যে বন্যাকবলিত এলাকার গবাদিপশুর জন্য ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচি শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মৎস চাষিদের ক্ষতির বিষয়েও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, আকস্মিক বন্যায় অনেক পুকুরের বাঁধ ভেঙে মাছ ভেসে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্যচাষিদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং সরকারের পক্ষ থেকে তাদের সহযোগিতা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য হলো বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক, প্রাণিসম্পদ খাত ও মৎস্যচাষিদের দ্রুত পুনর্বাসনের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন সরবরাহ করা হবে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ক্ষতিগ্রস্ত ৫ জেলা (চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি) ১৫৬ টি ইউনিয়নের ১লাখ ৫৭ হাজার ৩শ গরু, ৪ হাজার ১৪৮ টি মহিষ, ১ লাখ ১২ হাজার ৬৫৫ টি ছাগল, ২৪ হাজার ৭৯৫ টি ভেড়া, ১১ লাখ ৯১ হাজার ২০ টি মুরগি এবং ২৪ হাজার ২৮ টি হাঁস বন্যাকবলিত হয়েছে। এর মধ্যে ৫ জেলায় গরু ৪৫ টি, ছাগল ১২৩টি, ভেড়া ৪০ টি, মুরগি ১ লাখ ১১ ৯৮ টি এবং হাঁস ১হাজার ৫২১টি মারাগেছে। ক্ষতিগ্রস্ত খামারের সংখ্যা গবাদিপশুর খামার ৬৫ টি এবং হাস-মুরগির খামার ৬৩টি। এতে ১১৮ মে.টন গো খাদ্য নষ্ট্ হয়েছে। এ নিয়ে গো-খাদ্য, অবকাঠামো, প্রাণিরমৃত্যু নিয়ে মোট ৩০ কোটি ১৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- দেশের ৬০২টি ইউনিয়নের ১২ হাজার ৪৩ মে. টন সাদামাছ, ১৪৪৯.৪৯ মে. টন চিংড়ি, ১৮৫৭.৩৯ ল্খা পোনা, এবং রেনু ২৫৯.৩৯ লাখ ভেসে গেছে। সাদা মাছের ক্ষতি হয়েছে ২১৭৮২.৭৬ লাখ টাকা, চিংড়ির ক্ষতি হয়েছে ৩০৯৯.৪৬ লাখ টাকা, পোনার ক্ষতি হয়েছে ৬২৬৬.৯২ লাখ টাকা। পি এল বা রেনুর ক্ষতি হয়েছে ১০৮৯.৫০ লাখ টাকার। নৌ যানের ক্ষতি হয়েছে ১৬৭.৪০ লাখ টাকা, জাল নষ্ট হয়েছে ১২৩.৭০ লাখ টাকার, অকাঠামো ও স্লুইস গেট, পুকুর, ঘের নষ্ট হয়ে ক্ষতি হয়েছে ৪৩৮২.৪৩ লাখ টাকা। এ হিসেবে মৎস্য খাতে মোট ক্ষতি হয়েছে ৩৬৮৯৭.৪৮ লাখ টাকা বা ৩৬৯ কোটি টাকা।
বিস্তারিত বিবরণে দেখা গেছে- চট্টগ্রামের ১৫৩ টি ইউনিয়নে ৩২০টি ঘের এবং ১২ হাজার ২৫১টি পুকুর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এক্ষত্রে সাদামাছ, চিংড়ি এবং চিংড়ির পোনা ও রেনু ক্ষতি হয়েছে যার মূল্য প্রায় ১০৯৪৩.১৯ লাখ টাকা। একই ভাবে খাগড়াছড়িতে ক্ষতি হয়েছে ২২৪.৫৬ লাখ টাকা। রাঙ্গামাটি জেলায় ক্ষতি হয়েছে ৩১৫.৫৯ লাখ টাকা। বান্দরবান জেলায় ক্ষতি হয়েছে ২১৪.৪৫ লাখ টাকা,কক্সবাজারের ৬১ টি উইনিয়নের মৎস্য খাতে ক্ষতি হয়েছে ৪৬২২.৩৬ লাখ টাকা। নোয়াখালীর ২১ টি ইউনিয়নে ১১০৯ লাখ টাকা। নীলফামারিতে ১০.২৪ লাখ টাকা, লালমনির হাটের ৪ ইউনিয়নে ২৮.৭০ লাখ টাকা, রংপুরে ৯৯.৪০ লাখ টাকা, গাইবান্ধার ১৪ টি ইউনিয়নে ১৭৭.২৫ লাখ টাকা, খুলনার ২১৫.১০ লাখ টাকা, সাতক্ষীরায় ৫০.৮০ লাখ টাকা, যশোরের ৪৪টি ইউনিয়নে ৫৫০০.৩৪ লাখ টাকা, নড়াইলের ৩৯টি ইউনিয়নের ৬৮৮৩.১০ লাখ টাকা, চুয়াডাঙ্গায় ৩০.৮০ লাখ টাকা, মৌলভীবাজারের ৪টি ইউনিয়নের ২৫ লাখ টাকা, সুনামগঞ্জের ১৯ টি ইউনিয়নে ১৪.৪২ লাখ টাকা, বরগুনার ২০ টি ইউনিয়নে ক্ষতি হয়েছে ৩৭৫.৪৫ লাখ টাকা, পিরোজপুরের ১৯টি ইউনিয়নে ক্ষতি হয়েছে ৩৮১ লাখ টাকা, ময়মনসিংহের ৪টি ইউনিয়নের ১৩.০১ লাখ টাকা, নেত্রোকোনার ১০টিতে ক্ষতি হয়েছে ৯৮.৬৯ লাখ টাকা, হবিগঞ্জের ১৭ টি ইউনিয়নে ১৪৫৩ টি পুকুর ভেসে গেছে এতে ক্ষতি হয়েছে ৪৮১৩ লাখ টাকা, সিলেটের ৯ টি ইউনিয়নের ২০৩টি পুকুর তলিয়ে যাওয়ায় ক্ষতি হয়েছে ৬১.২৬ লাখ টাকা, ভোলার ৪৭ টি ইউনিয়নের প্রায় ৪ হাজার পুকুর ও ঘের তলিয়ে যাওয়ায় ক্ষতি হয়েছে ৫৮২.৯৪ লাখ টাকা এবং পটুয়াখালীর ৯৭ টি ইউনিয়নের ২৫৮৪ টি পুকুর ও খামার তালিয়ে গেছে এতে ক্ষতি হয়েছে ১৪৪৭.৩০ লাখ টাকা।