কৃষি সংবাদ প্রতিবেদক:
দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং করোনার দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাবে দেশের প্রাথমিক স্তরের শিশুদের ৫৫.২ শতাংশ ভীতি বা আতঙ্কগ্রস্ত রয়েছে। এছাড়াও স্কুলে না যাওয়ার প্রবনতায় ৩৬.৯ শতাংশ, মানসিক ক্ষতি সাধন ২৮.৬ শতাংশ, পড়ালেখায় অমনোযোগী ৩৬.৫ শতাংশ এবং ৭.৯ শতাংশ শিশুর মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়াগেছে। গতকাল রাজধানীর বিআইসিসির মিডিয়া বাজারে গণসাক্ষরতা অভিযান এবং ব্র্যাক শিক্ষা উন্নয়ন ইনস্টিটিউট আয়োজিত ‘প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়ন: আমাদের কারণীয়’ বিষয়ক আলোচনা সভায় এ গবেষণার তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে।
সভায় টিচার ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউচের (টিডিআই) এর পরিচালক অথ্যাপক নাজমুল হক এই গবেষণা প্রবন্ধ তুলে ধরে বলেন, শিশুদের মধ্যে সৃষ্ট মানসিক পরিবর্তন হয়েছে। এর মধ্যে ৪৫.৮ শতাংশ অস্থিরতা এবং ট্রমা আক্রান্ত, শিক্ষায় অমনযোগী ১৯.২ শতাংশ, উচ্ছৃঙ্খলতায় ১৫.৩ শতাংশ, শিক্ষাক্রমের বিরুপ প্রভাবে মধ্যে রয়েছে ৪.৪ শতাংশ, ডিভাইসে আসক্তি রয়েছে ১৩.৮ শতাংশের, ভীত সন্ত্রস্ত থাকছে ৬.৯ শতাংশ, আতঙ্কিত ২৩.২ শতাংশ এবং নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন ১৯.৭ শতাংশ শিশু।
সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার বলেন, আজকের শিশুরাই আগামী দিনের কর্নধার। একারণে তাদের প্রতি আমাদের সহনশীল হতে হবে। তাদের উন্নয়নে সরকার কাজ করছে। ছোট কোমলমতি শিশুদের মানসিক বিকাশের জন্য আমরা কাজ করছি। এ জন্য দেশের প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর নান্দনিত রুপ দেওয়া হচ্ছে। যেখানে থাকলে তাদের মানসিক বিকাশ হবে।
তিনি আরো বলেন, আমরা ক্লাস্টার ভিত্তিতে কিছু সংখ্যক সংস্কৃতি ও শারীর চর্চা বিষয়ক শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার উদ্যোগ হতে নিয়েছি। তারপরেও আমরা চিন্তাভাবনা করছি, শিশুদের ভীতি ও মানসিক পরামর্শ্যরে জন্য কাউন্সিলর নিয়োগ করা হবে।
তিনি বলেন, ছাত্র জনতার গণ অভ্যুথানের দেয়ালে যে সকল গ্রাফিতি অংকন করা হয়েছে। যেগুলো খুবই গুরুত্ব বহন করছে। এটি আমাদের পরিবর্তনের সুচনা করেছে। আমরা পরিবর্তনের দিকে এগুচ্ছি। আমি প্রত্যন্ত এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঘুরে দেখছি যেখানে যা দরকার তার ব্যবস্থা পত্র দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আমাদের সরকারি বিদ্যালয়ে সকল সুযোগ সুবিধার পরেও শিক্ষার্থী কেন কম তা দেখা হচ্ছে। আমরা দ্রুতি সময়ের মধ্যে দেশের ১৫০ টি উপজেলার সকল বিদ্যালয়ে মিডডে মিল চালুর উদ্যোগ নিয়েছি।
তিনি আরো বলেন, আমাদের দেশের অবস্থা বিবেচনা করে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে জেলা ও বিভাগ উপযোগী পাঠদানের সময় সূচি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
গবেষণা প্রতিবেদনে জানানো হয়, শিশুদের মধ্যে সমাজ সম্পর্ক নেতিবাচক আচরণ প্রকাশ করে ২৫ দশমিক ৬ শতাংশ, ভীত সন্ত্রস্ত অবস্থার প্রকাশ করে ৫৩ দশমিক ৭ শতাংশ, অগ্রহযোগ্য আচরণ প্রকাশ করে ১৮ দশমিক ২ শতাংশ, লেখাপড়ায় পিছিয়ে পড়া ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ, সোস্যাল মিডিয়ায় আসক্তি ১৭ দশমিক ৭ শতাংশ, বিদ্যালয়ে অনুপস্থিতি ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ, মেজাজ দেখানো ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ, সহিংস আচরণ ২৪ দশমিক ৬ শতাংশ এবং ঘুমের ব্যাঘাত ১৭ দশমিক ৭ শতাংশ।
গবেষণা প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয় দেশের আটটি বিভাগের মোট ২০৩টি সংগঠেনের সহায়তায়। ৩৬০ জনের উপস্থিতিতে ১২টি ফোকাস গ্রুপের আলোচনা, ৩০ জন তথ্যাভিজ্ঞ ব্যক্তির মতামত ২টি বিভাগীয় এবং ২টি জাতীয় পর্যায়ের সভার মাধ্যমে গবেষণার উপত্ত সংগ্রহ করা হয় ৬০০ উপস্থিতির মাধ্যমে।
গবেষণা প্রতিবেদনে সরকারে বিভিন্ন সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে শিশু সুরক্ষা আইন (২০১৩) যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা, শিক্ষক-প্রশিক্ষণের পাঠ্যক্রমে মানসিক স্বাস্থ্যবিষয় অন্তর্ভুক্ত করা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ট্রমা কাউন্সেলিং কর্মসূচি আয়োজন করা, শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যসমস্যা নিরুপনের জন্য শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধি করা, শিক্ষার্থীদের জন্য খেলাধুলা ও অন্যান কর্মসূচি পালনের লক্ষ্যে বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ ব্যবহারের সুযোগ ও উন্মুক্ত রাখা এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় পর্যাপ্ত সম্পদ ও বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করা।
জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মতে সরকারের করণীয় সম্পর্কে বলা হয়েছে- শিশুদের জন্য খেলার মাঠ ও সরঞ্জাম চেয়েছেন ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ, বিনোদন কার্যক্রম গ্রহণ করার কথা বলেছেন ২২ দশমিক ২ শতাংশ, শিশু সুরক্ষা আইন (২০১৩ বাস্তবায়নের কথা বলেছেন ৭ দশমিক ৯ শতাংশ, চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা করা ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ, টিভিতে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক অনুষ্ঠানের নিয়মিত আয়োজন করা ১১ দশমিক ৮ শতাংশ, শিশুদের দলীয় রাজনৈতিক কার্যক্রম থেকে বিরত রাখা ১০ দশমিক ৩ শতাংশ, বিদ্যালয়ে সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ব্যবস্থা করা ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ, শিশুদের নিয়মিত কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করার কথা বলেছেন ৫৫ দশমিক ২ শতাংশ, শিশুদের নৈতিক মূল্যবোধ বিকাশী কার্যক্রম হাতে নিতে বলেছেন ৭ দশমিক ৯ শতাংশ।
এছাড়া গবেষণা প্রতিবেদনে শিশুদের সহায়তা করার সুপারিশ, এনজিও বা সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সুপারিশ, শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য সুপারিশ, অভিভাবকদের জন্য সুপারিশ, বিদ্যালয়গুলোর জন্য সুপারিশ এবং সরকারের করণীয় নিয়ে সুপারিশ করা হয়েছে।
সভাপ্রধান হিসেবে অনুষ্ঠানটি সঞ্চলনা করেন গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে অংশ নেন এডুকেশন ওয়াচের আহ্বায়ক ড. আহমেদ মোশতাক রাজা। সম্মানিত অতিথিদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের সিনিয়র অ্যাডভাইজর ড. মুহাম্মদ মুসা। অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন গণসাক্ষরতা অভিযানের উপরিচালক তপন কুমার দাশ। গবেষণা প্রণয়ন করেন গণসাক্ষরতা অভিযানের কার্যক্রম ব্যবস্থাপক আব্দুর রউফ।