কৃষি সংবাদ প্রতিবেদক :
অন্তর্বর্তী সরকারের নতুন তিন উপদেষ্টা শপথ নিয়েছেন। গতকাল সন্ধ্যা ৭টা ৩৭ মিনিটে বঙ্গভবনের দরবার হলে এ শপথ অনুষ্ঠিত হয়। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তাদের শপথ পাঠ করান। এসময় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ অন্য উপদেষ্টারা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আব্দুর রশীদ।
শপথ নেওয়া নতুন উপদেষ্টারা হলেন- ব্যবসায়ী সেখ বশির উদ্দিন, চলচ্চিত্র পরিচালক মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মাহফুজ আলম। এর আগে চার দফায় শপথ গ্রহণ করেন অন্তর্বর্তী সরকারের ২১ উপদেষ্টা। এর মধ্যে ৮ আগস্ট শপথ নেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ ১৪ উপদেষ্টা। ঢাকা ও দেশের বাইরে থাকায় তিন উপদেষ্টা সেদিন শপথ নেননি। পরে ১১ আগস্ট শপথ নেন উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা ও বিধান রঞ্জন রায়। আর ১৩ আগস্ট শপথ নেন আরেক উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম। পরে ১৬ আগস্ট আরও চার উপদেষ্টা শপথ নেন।
উপদেষ্টা পরিষদে নতুন মুখ সেখ বশির উদ্দিন :
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে যুক্ত হয়েছেন আকিজ বশির গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেখ বশির উদ্দিন। তিনি সেখ আকিজ উদ্দিনের সন্তান। সেখ বশির উদ্দিনের প্রতিষ্ঠিত ‘আকিজ বশির গ্রুপ’ বর্তমানে একটি বহুমুখী গ্রুপ হিসেবে ১৮টি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে। এর মধ্যে রয়েছে সিরামিকস, টেবিলওয়্যার, বাথওয়্যার, জুট, পার্টিকেল বোর্ড, ডোরস, প্যাকেজিং, গ্লাস ইত্যাদি। প্রতিষ্ঠানটি ৩টি দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং ২৫টির বেশি দেশে পণ্য রপ্তানি করছে। একই সঙ্গে ২৬ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা ও দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।
উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী :
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নিয়েছেন চলচ্চিত্র নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। বাংলাদেশি সিনেজগতে ফারুকী যেন নতুন এক ফিলোসফার। একাধারে চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক, চিত্রনাট্যকার ও নাট্যনির্মাতা তিনি। নিজস্ব ঢঙে নাটক, চলচ্চিত্র নির্মাণের তাগিদে তৈরি করেছেন ‘ছবিয়াল’ নামে একটি সংগঠন। ভিন্ন ধারার সিনেমার সঙ্গে দেশের মানুষকে অভ্যস্ত করে তুলেছেন। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে নিজের চিহ্ন রেখেছেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও।
১৯৭৩ সালের ২ মে ঢাকার নাখালপাড়ায় জন্ম মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর। তার বাবার নাম আবদুর রব, মা কুলসুম বেগম। ২০১০ সালে বিয়ে করেন দীর্ঘদিনের সহকর্মী ও জনপ্রিয় টিভি অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশাকে। ইলহাম নুসরাত ফারুকী নামে একটি কন্যাসন্তান রয়েছে তাদের।
১৯৯৯ সালে মিডিয়ায় পথচলা শুরু করেন ফারুকী। ছোট পর্দায় অসাধারণ কিছু টেলিফিল্ম ও সিরিয়াল নির্মাণ করেছেন তিনি। ‘স্পার্টাকাস ৭১’, ‘চড়ুইভাতি’, ‘কানামাছি’ ও ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি’র মতো নন্দিত টেলিফিল্ম তৈরি করেছেন ফারুকী। পাশাপাশি ‘একান্নবর্তী’, ‘সিক্সটিনাইন’ ও ‘৪২০’ তার নির্মিত জনপ্রিয় কিছু সিরিয়াল। আনিসুল হকের ‘আয়েশামঙ্গল’ অবলম্বনে ফারুকী নির্মিত ‘আয়েশা’ নাটকটিও পেয়েছে দর্শকপ্রিয়তা। সিনেমায় ফারুকীর সূচনা ‘ব্যাচেলর’ চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে। গল্পের গাঁথুনি, নিজের প্রজ্ঞা ও মুনশিয়ানার মিশেলে সামাজিক সম্পর্কগুলোর অসংগতি নিপুণভাবে সেলুলয়েডের ফিতায় ফুটিয়ে তোলেন এই নির্মাতা। তার তৈরি সিনেমার সংলাপ থেকে শুরু করে গান—সবই হয়ে ওঠে তরুণদের ক্রেজ। ব্যাপক সাড়া জাগায় তার নির্মিত ‘থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার’ সিনেমাটিও। ২০০৯ সালে মুক্তি পাওয়া তার এই ছবি ‘পুসান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব’, ‘রোটেরডেম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব’, ‘ফ্রাইবুর্গ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব’ ও ‘আবুধাবি চলচ্চিত্র উৎসব’-এ অফিসিয়াল সিলেকশনে ছিল।
এ ছাড়া ২০১০ সালে ‘টিবুরন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব’, ‘জোগজা-নেপটেক এশিয়ান ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল’-এ গোল্ডেন হ্যানোমেন অ্যাওয়ার্ডের জন্য নির্বাচিত হয় সিনেমাটি। ২০১৪ সালে ‘কেস উইক চলচ্চিত্র উৎসবে’ প্রদর্শনীর পাশাপাশি ৮৩তম অস্কারে বিদেশি ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে ফারুকী নির্মিত এই সিনেমা। ২০১২ সালে ‘টেলিভিশন’, ২০১৩ সালে ‘পিঁপড়াবিদ্যা‘ এবং ২০১৭ সালে ‘ডুব’ সিনেমা নির্মাণ করে নিজের জাত চেনান ফারুকী। ২০১৪ সালে ‘বুসান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে’ সমাপনী ছবি হিসেবে ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার হয় ‘টেলিভিশন‘ সিনেমার। বুসানে ‘এশিয়ান সিনেমা ফান্ড ফর স্ক্রিপ্ট ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড পোস্ট-প্রোডাকশন’-এর পুরস্কার জিতে নেয় তার নির্মিত সিনেমা টেলিভিশন। এমনকি ৮৬তম অস্কারেও বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে। ‘মেড ইন বাংলাদেশ‘ ছবিতে ফারুকী দেখিয়েছেন দুর্দান্ত পলিটিক্যাল স্যাটায়ার। ২০০৮ সালে ‘ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে‘ সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার পায় এই সিনেমা।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী থেকে উপদেষ্টা মাহফুজ আলম :
মাহফুজ আলমের নিয়োগের পর থেকেই সবার মনে প্রশ্ন, কে এই মাহফুজ আলম? ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে সেভাবে আলোচনায় না থাকলেও হঠাৎ করে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী হয়ে যাওয়ায় তাকে নিয়ে সবার মনে প্রশ্ন উঠতে থাকে।
মাহফুজ আলমের বাড়ি লক্ষ্মীপুর উপজেলার রামগঞ্জ উপজেলার ইসাপুর গ্রামে। পড়াশোনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী তিনি। এছাড়া ছাত্র সংগঠন গণতান্ত্রিক ছাত্রশক্তির তাত্ত্বিক নেতা হিসেবে ক্যাম্পাসে পরিচিত তিনি। মাহফুজ আলমের প্রথম আলোচনায় আসেন শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ করে দেশ ছাড়ার পর। এর কিছুদিন পর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম রয়টার্সকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধি হয়ে একটি বিশেষ সাক্ষাৎকার দেন তিনি। সেখানে নতুন রাজনৈতিক সংগঠন খোলাসহ গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা ধরে রাখা, সরকারকে সংহত করা, রাষ্ট্র ও সমাজের নানা অংশীজনের সঙ্গে বলে আগামী বাংলাদেশের রূপরেখা তৈরির কথা জানান।